প্রসঙ্গ যাকাতের কাপড় আনতে ভিড়ে পদদলিত হয়ে মৃত্যু

নিম্ন আয় থেকে সম্প্রতি নিম্ন-মধ্যম আয়ে প্রমোশন পাওয়া একটি দেশে যাকাতের কাপড় আনতে ভিড়ে পদদলিত হয়ে ২৩ জনের মৃত্যু, আহত অর্ধ শতাধিক! বিশ্বাস করা সম্ভব?! দেশটা বাংলাদেশ হলে যেন সবই সম্ভব!

এ যেন ব্যাংক ও শেয়ার বাজার থেকে কোটি মানুষের অর্থ হরিলুট করে পুঁজিবাদী-সুদী অর্থনীতির ঘাড়ে বসে ফুলে ফেঁপে বড়লোক হওয়া মানুষরূপী হায়েনাদের কৃত্রিম মধ্য-আয়ের বাংলাদেশের পদতলে পদদলিত দারিদ্রপীড়িত দিন-আনি-দিন-খাই-অভাবী মানুষগুলোর সত্যিকারের দরিদ্র বাংলাদেশ।

যাকাতের নামে এ এক মশকরা। আল্লাহর সাথে মশকরা, মানুষের সাথে মশকরা, মানুষের হক নিয়ে মশকরা। ‘যাকাতের শাড়ি’ টার্মটা যাকাতের মতো বৃহত্তম ইবাদাতকে খাটো করার জন্য যথেষ্ট।

আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষ যাকাত আদায় করেন না। অল্প যে ক’জন করেন, তাদের অনেকেই ঠিক মতো হিসাব করেন না। অনুমানের ভিত্তিতে ‘যাকাতের শাড়ি’ কিনে দিয়ে দেন। তাদের আবার বড় একটা অংশ ঢাক-ঢোল পিটিয়ে এই শাড়ি বিলি করেন। এতে যথাসম্ভব সরু জায়গা বেছে নেয়া হয়, যেমন কোনো প্রতিষ্ঠানের গেট ইত্যাদি। যত মানুষ ঠেলাঠেলিতে আহত-নিহত হবে, তত বেশি নাম।

শাড়ি দিয়ে উপকার করার সদিচ্ছা থাকলে খোলা মাঠে দেয়া যেত। আর কারো তো আসারও প্রয়োজন ছিল না। নিজেদের উদ্যোগে পুরো গ্রামের মহিলাদের লিস্ট করে ঘরে ঘরে পাঠিয়ে দেয়া যায়। আর যাকাত আদায়ের সত্যিই ইচ্ছা থাকলে শাড়ি কেন? শাড়ি গরীবের কী উপকারে আসে? তাও আবার দুই শ’ টাকার ‘যাকাতের শাড়ি’? তারা এসব শাড়ি সংগ্রহ করে পুনরায় শ’ দেড়শ’ তে বিক্রয় করে। এরপর অল্প যা কিছু তরল টাকা সংগ্রহ হয়, তা-ই তাদের সম্বল। এর চেয়ে দুইশ টাকা হাতে দিয়ে দিলে কষ্টটা কম হত না?

আর দুই শ’ টাকায়ই বা কী হয়! ‘যাকাতের শাড়ি’ না দিয়ে ‘যাকাতের গাড়ি, যাকাতের সাইকেল, যাকাতের রিক্সা, যাকাতের সেলাই মেশিন, যাকাতের কম্পিউটার, ল্যাপটপ’ দেয়া হোক, যদি এভাবে ঢাকঢোল পিটিয়ে দিতেই হয়!

যাকাত গরীবের হক, ধনীর সম্পদে। এটা ঠিক অনুদান না। এর ট্রিটমেন্ট ঋণের মতো। অর্থাৎ ব্যক্তি যেন যাকাত পরিমাণ টাকার ঋণী হয়ে গেল। এখন যত দ্রুত সম্ভব তা পরিশোধে ব্যস্ত হতে হবে। যেহেতু এটা ঋণ/ দায়ের মতো, তাই তার হিসাবটা হতে হবে পুঙ্খানুপুঙ্খ।

ঋণের ক্ষেত্রে যেমন যিনি পাওনাদার, তাকে খুঁজে বের করে পরিশোধ করতে হয়, এখানেও ঠিক যাকাতের হকদারদেরকে খুঁজে বের করে যাকাত আদায় করতে হবে। এর মাথাব্যথা যাকাতদাতার, গ্রহীতার নয়।

মালয়েশিয়ায় যে কয়টা বিষয় অনুকরণীয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো, সরকার কর্তৃক যাকাত ব্যবস্থাপনা। চাকুরীজীবীরা স্যালারি/ পে-রোল থেকে যাকাত আদায়ের আবেদন করতে পারেন। এতে প্রতি মাসেই তার স্যালারি থেকে যাকাত কেটে নেয়া হবে। এবং যে পরিমাণ টাকা যাকাত হিসেবে কাটা হবে, তা ইনকাম ট্যাক্স হিসেবে পরিশোধ করতে হবে না।

যাকাত ফান্ডের টাকা থেকে মালয়েশীয় মুসলিম নাগরিক, যিনি গরীব, ঋণী – ইত্যাদি যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত হবেন, তিনি যাকাত গ্রহণের আবেদন করতে পারবেন। স্কুল সহায়তা, ব্যবসায়িক সহায়তা, ট্যাক্সি সহায়তা (লাইসেন্স থেকে গাড়ি পর্যন্ত), বাড়ি পুন:নির্মাণ, একান্ত প্রয়োজনীয় সফর, শিক্ষা সহায়তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রামাদান, বিবাহ সহায়তা, ঋণ পরিশোধ, স্কলারশিপ, দুর্যোগ পরবর্তী সহায়তা, কুরআনের হিফয সহায়তা, প্রতিবন্ধীদের জন্য মোটরসাইকেল, শরীয়াহ বিচার নিষ্পত্তিতে আইনি ফি পরিশোধ সহায়তা, তাকাফুল – ইত্যাদি বিভিন্ন খাতে যাকাত গ্রহণের আবেদন করা যাবে। উলামা ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয় কমিটি তা অনুমোদন করলে ব্যক্তি যাকাত গ্রহণ করতে পারবেন।

আমাদের দেশে ইদানীং যাকাত নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে। যাকাত ফেয়ার হচ্ছে বছর কয়েক ধরে। সরকারীভাবেও যাকাত দেয়া, ও দেয়ার সঠিক পদ্ধতি, এবং তা ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ গ্রহণ জরুরী।

====

যাকাত নিয়ে বিস্তারিত: http://yousufsultan.com/zakat-in-details/
মালয়েশিয়ার যাকাত ব্যবস্থাপনা: http://www.zakat.com.my/
মালয়েশিয়ায় যাকাতের আবেদন ও খাতসমূহ:http://www.maiwp.gov.my/i/in…/perkhidmatan-kami/agihan-zakat