নাস্তিকতা ও সংশয়বাদিতার শুরু : একটি কেইস স্টাডি

পূর্বের স্ট্যাটাসের ফলো আপ: পূর্বের স্ট্যাটাসটি প্রকাশের পর অনেকে ইনবক্সে যোগাযোগ করেছেন। বিশেষ করে যারা এখনো সংশয়বাদীর স্টেজে আছেন, সম্পূর্ণ নাস্তিকে পরিণত হন নি। অনেকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। সর্বশেষ গতকাল এক ভাই ফোন করে আর্জেন্ট দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এবং আজ জামিয়ায় এসে তিনি সাক্ষাত করেন।

আমাদের এই ভাই সদ্য ইঞ্জিনিয়ারিং (Bsc) পড়াশোনা সমাপ্ত করেছেন। কিন্তু গত এক মাস ধরে তিনি অত্যন্ত বিচলিত। সবসময় অস্থিরতায় ভুগছেন। প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছে যে তিনি নাস্তিক হয়ে যাচ্ছেন। সন্দেহ হচ্ছে আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে, হাদীসের বিশুদ্ধতা নিয়ে, কুরআনে অবিকৃত অবস্থা নিয়ে। অস্থিরতা এমন পর্যায়ে যে বেশ কয়েকবার আত্মহত্যার চিন্তাও করেছিলেন। কথা বলতে বলতে বারবার কেঁদে ফেলছিলেন।

তিনি জানান, ঈমানের ওপর প্রথম আঘাত আসে শৈশবে। জনৈক বুদ্ধিজীবীর লেখা প্রায় সব সাইন্স ফিকশন তার পড়া। তিনি বলেন, তার সাইন্স ফিকশনগুলোর প্রায় কমন একটি বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে একজন হিরো থাকে। সে কোনো ‘গড’কে বিশ্বাস করে না। সেখানে বলা হয়, গড মানুষের সৃষ্টি। মানুষ একে অপরের সাথে যুদ্ধ করার জন্য গড বানিয়েছে। ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব বিষয়ে শৈশবেই তাকে কিছুটা সন্দিহান করে তোলে।

বড় হয়ে ফেইসবুক খুললেই তিনি নাস্তিকদের প্রোপাগান্ডার শিকার হন। এবং উত্তর না জানার কারণে তাদের যুক্তিগুলো তাকে অস্থির করে তোলে। তিনি ভুলে যেতে চান, পারেন না। এছাড়া ফেইসবুকে বিভিন্ন ইসলামী গ্রুপের পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়িও তাকে সন্দেহে নিমজ্জিত করে।

সর্বশেষ পারিবারিক কিছু আচরণ তাকে বেশ মর্মাহত করে। গত রমজান মাসে পারিবারিক চাপে বাধ্য হয়ে দাড়ি ছেঁটে ফেলতে হয়। বাসায় ইসলাম নিয়ে নেটে কিছু পড়তে দেখলেই মা চেঁচামেচি করেন, “এগুলো পড়ে কী হবে? এগুলো কি ভাত দিবে নাকি?”

যাই হোক, তার মনে নানা প্রশ্ন। এবং সবচেয়ে বড় যে বিষয় সেটা হলো তিনি চাচ্ছেন না সন্দেহ করতে, তবু সন্দেহ চলে আসছে এবং মনে হচ্ছে যে ঈমান চলে গেছে।

আমি বললাম, আপনার ঈমান যায় নি এবং ইনশা’আল্লাহ আপনি একজন মুমিন এবং জান্নাতের প্রত্যাশী। কাজেই প্রথমত নিশ্চিন্ত মনে ভালবাসা নিয়ে নামায পড়ুন, বেশি বেশি লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ পড়ুন, ইনশা’আল্লাহ অন্তরের অস্থিরতা দূর হয়ে যাবে।

দ্বিতীয়ত, যেসব সোর্স আপনার মনে সন্দেহ ঢুকাচ্ছে (বর্তমানে ফেইসবুক) সেগুলো কিছুদিন এড়িয়ে চলুন। সম্ভব হলে মাস খানেক ফেইসবুক থেকে দূরে থাকুন।

তৃতীয়ত, আমরা যে বিষয়ে জানি না, সে বিষয়ে যে যা-ই বলে তা অন্তর গ্রহণ করে নেয়। বা কমপক্ষে সন্দেহ সৃষ্টি করে। কাজেই সন্দেহ দূর করতে পড়াশোনা ও জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

জ্ঞানার্জনে প্রথমে তাকে রাসূলের স. সীরাত ভালবাসা নিয়ে পড়তে বললাম। তিনি জানালেন, তিনি তা শুরু করেছেন। এরপর মুফতী তাকী উসমানী হাফিজাহুল্লাহুর কুরআনের তাফসীর, যা বাংলা হয়েছে তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন নামে, তা পড়তে বললাম।

এরপর ইনশা’আল্লাহ বিষয়ভিত্তিক পড়তে বলা হবে। যে বিষয়ে সন্দেহ, নির্দিষ্টভাবে সে বিষয়ের ওপর গভীর অধ্যয়ন করা হবে। পড়াশোনার অগ্রগতি তিনি নিয়মিত জানাবেন ইনশা’আল্লাহ। এবং নিয়মিত সাক্ষাত করে আমরা আলোচনা করব ইনশা’আল্লাহ।

আমরা তার জন্য দোয়া করি, আল্লাহ তাকে ঈমানের দিকে ফিরিয়ে আনুন। আমীন।

এই ভাইয়ের সাথে সাক্ষাত হওয়ার পর প্রজন্মের ঈমান নিয়ে নতুন করে পেরেশানি শুরু হয়েছে। যে প্রজন্মের কৈশোর কাটে নাস্তিকতা প্রভাবিত সাইন্স ফিকশনে, আর যৌবন কাটে নাস্তিকদের প্রোপাগান্ডায়, সে প্রজন্মের কাছে মতপার্থক্যের মাসয়ালাগুলো অর্থহীন, ঈমানী দীনতা তাদের প্রকট।

এই প্রজন্ম আমাদের সাথেই মসজিদে নামায পড়ে, রমজানে রোজা রাখে, কিন্তু একাকী ফেইসবুকে হয়ত নাস্তিকতা চর্চা করে, নয়ত তাদের প্রোপাগান্ডার শিকার হয়। আমাদের পরস্পর অহেতুক কাজ বাদ দিয়ে তাদের নিয়ে গভীরভাবে ভাবা উচিৎ।

আমি আগে বিভিন্ন সেমিনারে বা ক্লাসে বলতাম যে, এই প্রজন্মের শতকরা নব্বই শতাংশের বেশি হয়ত নাস্তিক, নয়ত সংশয়বাদী। অর্থাৎ ঈমান নামক নিশ্চিত বিশ্বাসের বাইরে। গত কয়েক দিন সেগুলোর সুনিশ্চিত প্রমাণ পাচ্ছি, যা আমি কখনোই আশা করি নি।

আমাদের বসে থাকার সময় নেই। কী করতে পারি, কীভাবে করতে পারি, তা নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা-গবেষণা হওয়া দরকার।

আমার মনে হয়, প্রত্যেক মাদ্রাসায় সপ্তাহে একদিন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সাথে বসার আয়োজন রাখা যেতে পারে। এতে মাদ্রাসায় ওপরের ক্লাসের ছাত্ররা, কয়েকজন শিক্ষক ও সেসব ছাত্ররা একটি নির্দিষ্ট টপিক আলোচনার পর উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর করবে। টপিকটা পূর্ব নির্ধারিত থাকবে, যা নিয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এবং মাদ্রাসার ছাত্ররা সবাই অধ্যয়ন করবে।

এভাবে প্রথম দিকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা উপস্থিত হবে, ধীরে ধীরে তারা তাদের বন্ধুদের নিয়ে আসবে। এবং কলেজ ও মাদ্রাসার ছাত্রদের মাঝে ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব তৈরি হবে।

সম্পর্কটা যখন ব্যক্তি পর্যায়ে তৈরি হবে, তখন ফায়দা হবে সবচেয়ে বেশি। সাধারণ যে কোনো বিষয়েও কলেজের ছাত্রটি মাদ্রাসার সেই ছাত্র-বন্ধুর সাথে পরামর্শ করবে। এতে সে দ্বীনের ওপর চলতে পারবে, আবার মাদ্রাসার ছাত্রটির মাঝেও প্রকৃত দাঈ বা দ্বীন প্রচারকের গুণ সৃষ্টি হবে।

আসুন আমরা সবাই মিলে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় এ ফিতনা মুকাবিলা করার চেষ্টা করি। আল্লাহ তায়ালা সহায় হোন। আমীন।

—–

পূর্বের স্ট্যাটাস: http://yousufsultan.com/some-questions-of-the-skeptics-and-an-open-letter-to-a-student/