Pages Menu
TwitterRssFacebook

Posted on Dec 3, 2013 | 15 comments

“স্বামী কি স্ত্রীকে মারতে পারবে?” – সূরা নিসার ৩৪ নং আয়াতে অর্থ ও ব্যাখ্যা

ভূমিকা:

কয়েদ দিন আগে ফেইসবুকে “স্বামী কি স্ত্রীকে মারতে পারবে?” শীর্ষক একটি আর্টিকেলের লিংক পেলাম। লেখক সেখানে সূরা নিসার ৩৪ নং আয়াতের প্রাচীন ও বর্তমান প্রচলিত অনুবাদের ওপর তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। এবং প্রচলিত অনুবাদে আয়াতটির যথার্থ অনুবাদ হয় নি –খানিকটা এমন উপসংহারে পৌঁছেছেন।

লেখক তাঁর নিবন্ধে আয়াতটিতে ‘প্রহার করা’ -র জন্য ব্যবহৃত শব্দ ضرب -র শাব্দিক ও আল-কুরআনে বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত এর অর্থগুলো নিয়ে বিষদ আলোচনা করেছেন। লেখকের সদিচ্ছাকে স্বাগত জানাই। ‘স্ত্রীকে প্রহার’ করার বিষয়টি জুলুম বিধায় আল্লাহর বাণীতে এর স্থান লাভের বিষয়টি তিনি মেনে নিতে পারেন নি।

যেহেতু বিষয়টি আল-কুরআনের তাফসীরের মতো গুরু বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট, এবং যেহেতু লেখকের আঙ্গিকে পর্যবেক্ষণ করলে আল-কুরআনের তাবৎ বিষয়েই প্রচলিত অনুবাদভিন্ন অন্য অর্থ গ্রহণ করার সুযোগ হয়ে ওঠে, যা বরং শরীয়তের ওপর হুমকিস্বরূপ, তাই বিষয়টি নিয়ে লেখার ইচ্ছে হলো।

 

সূরা নিসার ৩৪ ও ৩৫ নং আয়াতে কী রয়েছে:

প্রথমে লেখকের লেখার কিছু উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করছি।

লেখক শুরুতে সূরা নিসার উক্ত আয়াতের প্রচলিত দুটো অনুবাদ উল্লেখ করেছেন। আয়াতটির মূল আরবী টেক্সট:

الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ وَاللَّاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا (34) وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا إِنْ يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا (35)

ডঃ জহুরুল হকের অনুবাদঃ

পুরুষরা নারীদের অবলম্বন, যেহেতু আল্লাহ তাদের এক শ্রেণীকে অন্য শ্রেণীর উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন, এবং যেহেতু তারা তাদের সম্পত্তি থেকে খরচ করে। কাজেই সতীসাধ্বী নারীরা অনুগতা, গোপনীয়তার রক্ষয়ীত্রি, যেমন আল্লাহ রক্ষা করেছেন। আর যে নারীদের ক্ষেত্রে তাদের অবাধ্যতা আশঙ্কা কর, তাদের উপদেশ দাও, আর শয্যায় তাদের একা ফেলে রাখো, আর তাদের প্রহার কর। তারপর যদি তারা তোমাদের অনুগত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে অন্য পথ খুঁজো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্ব জ্ঞাতা, মহামহিম। (৪:৩৪)

মুহিউদ্দিন খানের অনুবাদঃ

পুরুষেরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল এ জন্য যে, আল্লাহ একের উপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোক চক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে। আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং প্রহার কর। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোনো পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সবার উপর শ্রেষ্ঠ। (৪:৩৪)

লেখক অতপর কয়েকটি অনুবাদের আলোকে নিম্নোক্ত অনুবাদ প্রস্তাব করেন:

পুরুষরা নারীদের সংরক্ষণকারী [ভরণপোষণকারী] কারণ আল্লাহ পুরুষদের কয়েকজনকে অন্যদের(নারী/পুরুষ) থেকে বেশি দিয়েছেন [অনুগ্রহ করেছেন, সন্মানিত করেছেন], এবং তারা(পু)নিজেদের সম্পত্তি থেকে খরচ করে। আর নীতিবান নারীরা আল্লাহর প্রতি অত্যন্ত অনুগত [ধর্ম প্রাণ, আন্তরিক, অনুগত], গোপন ব্যাপারগুলো গোপন রাখে যা আল্লাহ তাদেরকে রক্ষা করতে বলেছেন। আর তাদের(স্ত্রী) মধ্যে যাদেরকে তোমরা(পু) অন্যায় আচরণ/বিদ্রোহাচারণ ভয় করো, তাদেরকে(স্ত্রী) তোমরাপু সতর্ক করো [উপদেশ, সাবধান,পরিণাম জানানো], তারপর তাদেরকে(স্ত্রী)তোমরা(পু) বিছানায় [শোবার ঘরে] ত্যাগ করো, এবং সবশেষে তাদেরকে(স্ত্রী) তোমরা(পু) আলাদা করে দাও/দৃষ্টান্ত দাও। তবে যদি তারা(স্ত্রী) তোমাদের(পু) সম্মতি দেয়, তাদের(স্ত্রী) বিরুদ্ধে কিছু করবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছু জানেন এবং সবচেয়ে প্রজ্ঞাময়। (৪:৩৪)

তিনি লিখেন,

প্রচলিত অনুবাদে তিনটি বিতর্কিত ব্যপার রয়েছে—

  • পুরুষরা স্ত্রীদের উপর কর্তৃত্ব করার অধিকার রাখে।
  • স্ত্রীরা স্বামীর প্রতি অনুগত হতে বাধ্য।
  • স্বামী স্ত্রীর অবাধ্যতার আশঙ্কা করলে স্ত্রীকে প্রহার করতে পারবে, যতক্ষন না স্ত্রী স্বামীকে বাধ্যতার প্রমাণ দেখিয়ে সন্তুষ্ট করতে না পারে।

অনেকেই এই আয়াতটি পড়ে বিভ্রান্তিতে পড়ে যান যে, কীভাবে আল্লাহ্‌ ﷻ, যিনি সবচেয়ে জ্ঞানী এবং সবচেয়ে দয়ালু, এরকম একটি পুরুষ পক্ষপাতী নির্দেশ কু’রআনে দিতে পারেন, যা যুগে যুগে স্ত্রীদেরকে পুরুষদের অধীন করে রাখতে এবং স্ত্রীদের উপর স্বামীর শারীরিক নির্যাতন সমর্থন করবে? তিনি কি জানেন না যে, স্বামীরা যখন দেখবে কু’রআন তাদেরকে তাদের স্ত্রীদেরকে প্রহার করার অনুমতি দিচ্ছে, তখন তারা তা ব্যাপকভাবে অপব্যবহার করবে? তাছাড়া স্ত্রীদেরকে প্রহার করাটা কীভাবে কোনো পারিবারিক সমস্যার সমাধান হতে পারে? স্বামীরা কি সবসময় সঠিক এবং স্ত্রীরা কি সবসময়ই ভুল করে?

সর্বশেষ মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে তিনি লিখেন,

এই প্রবন্ধে প্রহার করার পক্ষে এবং বিপক্ষে—দুটো দিকই ব্যাখ্যা করা হলো। আপনি সিদ্ধান্ত নিয়ে দেখুন কোনটা আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়।

উল্লেখ্য, লেখক এখানে কুরআনের আয়াতের তাফসীরের ব্যাপারটি পাঠকের গ্রহণযোগ্যতা বা বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেন। যা মোটেও উচিৎ হয় নি।

 

৩৪ নং আয়াতে قوامون শব্দের অর্থ:

লেখক আয়াতের প্রথম দিকে থাকা قوامون শব্দটি নিয়ে লিখেছেন।

আরবি قَوَّامُونَ কা’ওয়ামুন্না শব্দটির অর্থ “কর্তৃত্ব” আর কোথাও নেই। কু’রআনে এই শব্দটি অন্যান্য আয়াতে সংরক্ষক, অটল থাকা, দাঁড়ান, পুনরুত্থান, ভরণপোষণ ইত্যাদি অর্থে ব্যবহার হয়েছে। এটি কা’ইম (যে যত্ন করে, যে কারও জন্য দায়ী) এর একটি বিশেষ রুপ। ২:২২৪ – ২:২৪২ পর্যন্ত আয়াতগুলোতে এটাই পরিস্কার হয় যে পারিবারিক সম্পর্কের ব্যপারে স্ত্রীরা পুরুষদের সমান অধিকার রাখে এবং পুরুষরা স্ত্রীদের ভরণপোষণ করার জন্য দায়ী। তাই কা’ওয়ামুন্না অর্থ ‘কর্তৃত্ব’ হবার কোনো যুক্তি বা প্রমাণ কোনোটাই নেই। বরং এর অর্থ হবে “সংরক্ষণকারী” বা “ভরণপোষণকারী”। [সুত্রঃ মুহম্মাদ আসাদ, আব্দেল হালেম, লালেহ বখতিয়ার, ইদিপ ইয়ুক্সেল]

قوامون আরবী ق-و-م শব্দমূল থেকে এসেছে। قيام –র প্রসিদ্ধ অর্থ হলো দাঁড়ানো। এছাড়া আরো বিভিন্ন অর্থে আসে। তন্মধ্যে একটি অর্থ হলো, হেফাজতকারী বা সংরক্ষণকারী। হেফাজত বা সংরক্ষণ করতে হলে কর্তৃত্বের প্রয়োজন হয়। যেমন গভর্ণর বা সরকার জনগণের হেফাজত করে। তাফসীরে তাওযীহুল কুরআনে চমৎকার অনুবাদ করা হয়েছে। (তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন মুফতী তাকী উসমানী হাফিজাহুল্লাহ কর্তৃক অনূদিত ‘আসান তারজামায়ে কুরআন’ –এর বাংলা অনুবাদ, অনুবাদ করেছেন মাওলানা আবুল বাশার হাফিজাহুল্লাহ।) এতে শব্দটির অনুবাদ করা হয়েছে ‘অভিভাবক’। অর্থাৎ পুরুষ হলো নারীর অভিভাবক, কাজেই তার সকল দায়দায়িত্ব পুরুষের। লেখকের এ অংশের সাথে কোনো দ্বিমত নেই।

 

قَانِتَاتٌ শব্দের অর্থ:

এরপর লেখক লিখেন,

অনুগত

আরবি قَانِتَاتٌ কা’নিতাতুন অর্থ কয়েকজন অনুবাদক করেছেন “স্বামীর প্রতি অনুগত”, অথচ কু’রআনে আর যত জায়গায় কা’নিতাতুন এবং তার অন্যান্য রূপগুলো এসেছে, তার প্রত্যেকটি “আল্লাহর প্রতি অত্যন্ত অনুগত” অর্থ করা হয়েছে। …. কয়েকজন অনুবাদক সেখানেও সুবিধামত “স্বামীর প্রতি অনুগত” ব্যবহার করেছেন কোনোই ভিত্তি ছাড়া।

আসলে قانتات মানে অনুগতা, ঠিকই আছে। তবে কার অনুগতা, এখানে আয়াতে স্পষ্ট শব্দ নেই। এমন ক্ষেত্রে আয়াতের আগের লিংক দেখা হয়। আলোচনা পুরুষকে নিয়ে হয়েছে, আবার আল্লাহর নেয়ামতের কথাও এসেছে। তাই তাফসীরকারকগণ এখানে ‘আল্লাহ ও স্বামীর প্রতি অনুগতা’ এমন তাফসীর করেছেন। আবার আয়াতের শেষাংশে সংশোধনীর তিনটি ধাপ উল্লেখ করা হয়েছে ‘যদি তারা (স্ত্রীরা) তোমাদের আনুগত্য করে…’। এখানে সুস্পষ্টভাবে ‘তোমাদের’ মানে ‘স্বামীদের’ উল্লেখ করা হয়েছে। তাই অনেকে শুধু ‘স্বামীদের আনুগত্য’ উল্লেখ করেছেন। তবে যেহেতু আল্লাহ শব্দটিকে মুতলাক বা ব্যাপক রেখেছেন, তাই অনুবাদেও ব্যাপক রাখলে ভালো হয়। এতে আল্লাহর এবং স্বামীর, উভয়েরই আনুগত্য বুঝানো হবে।

আয়াতের এই অংশে আল্লাহ তায়ালা সাধ্বী নারীদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করছেন। তিনি বলেন, সাধ্বী নারীরা আল্লাহর অনুগত, তাদের স্বামীদের অনুগত এবং স্বামীর অগোচরে গোপন ব্যাপারগুলোর সংরক্ষণ করে। অর্থাৎ নিজের সতিত্ব, স্বামীর সম্পদ, সম্মান ইত্যাদি নষ্ট করে না।

 

اضْرِبُوهُنَّ অর্থ:

এরপর লেখক আয়াতে প্রহারের অংশ নিয়ে লিখেছেন। মূলত পুরো লেখার মূল পয়েন্ট এটাই। তিনি লিখেন:

আরবি اضْرِبُوهُنَّ ইদ্‌রিবু’হুন্না শব্দটি ৪:৩৪ আয়াতে বাংলা করা হয়েছে “তাদেরকেস্ত্রী প্রহার কর”। অথচ এই আরবি শব্দটির অনেকগুলো অর্থ হয় যা কু’রআনে বিভিন্ন আয়াতে ভিন্ন ভিন্ন অনুবাদ করা হয়েছে। এই শব্দটি এসেছে মূল ض ر ب দা-রা-বা থেকে যার অর্থগুলো হল—

  • ভ্রমণ করা, চলে যাওয়া – ৩:১৫৬, ৪:১০১, ৩৮:৪৪, ৭৩:২০, ২:২৭৩।
  • আঘাত করা – ২:৬০, ২:৭৩, ৭:১৬০, ৮:১২, ২০:৭৭, ২৪:৩১, ২৬:৬৩, ৩৭:৯৩, ৪৭:৪।
  • প্রহার করা – ৮:৫০, ৪৭:২৭।
  • উপস্থাপন করা – ৪৩:৫৮, ৫৭:১৩।
  • উদাহরন, প্রতীক, দৃষ্টান্ত দেওয়া – ১৪:২৪, ১৪:৪৫, ১৬:৭৫, ১৬:৭৬, ১৪:১১২, ১৮:৩২, ১৮:৪৫, ২৪:৩৫, ৩০:২৮, ৩০:৫৮, ৩৬:৭৮, ৩৯:২৭, ৩৯:২৯, ৪৩:১৭, ৫৯:২১, ৬৬:১০, ৬৬:১১।
  • দুর্দশা পতিত হওয়া – ২:৬১।
  • ঢেকে দেওয়া – ১৮:১১।
  • পার্থক্য করা – ১৩:১৭।
  • ফেরত নেওয়া – ৪৩:৫।

প্রশ্ন আসে: কেন এতগুলো মানে থাকতে “প্রহার” মানেটিই বেছে নেওয়া হল যখন স্ত্রীদের কথা আসে?

এ অংশের আলোচনার আগে বলে নেই, যে কোনো ভাষায়ই একই শব্দে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। এ ক্ষেত্রে তার صلة বা লিংক বা আগে পরের শব্দ/ ক্ষেত্র অনুসারে অর্থ পরিবর্তিত হয়। ইংরেজী একটি উদাহরণ দেই। Take একটি ক্রিয়া। সাধারণ অর্থ নেয়া বা গ্রহণ করা। কিন্তু take এর সাথে in, down, into, to –ইত্যাদি আসলে একেকটির একেক রকম অর্থ হয়।

তেমনি আরবীতে ض-ر-ب শব্দমূলের মূল অর্থ تحرك বা নড়াচড়া, action, motion ইত্যাদি। কিন্তু পরের শব্দের ভিন্নতায় এর নানারকম অর্থ হতে পারে। যেমন: (প্রত্যেকটিতে ضرب যোগে):

  1. القلب: হার্টবিট করা
  2. العرق: রক্ত উত্তেজিত হওয়া
  3. الضرس: ব্যথা বেড়ে যাওয়া
  4. في الأرض: দূরে যাওয়া/ সফর করা
  5. في الماء: সাঁতার কাটা
  6. في الأمر بسهم ونحوه: শরীক হওয়া
  7. عن الأمر: বিরত থাকা
  8. اللون إلى اللون: ধাবিত হওয়া
  9. إليه: ইশারা করা
  10. على المكتوب وغيره: সীল বা মোহর মারা, ঢেকে দেয়া
  11. الشيء ضربا: আঘাত করা, প্রহার করা
  12. له مثلا: উদাহরণ দেয়া/ উদাহরণ উল্লেখ করা
  13. له أجلا: সময় নির্ধারণ করা
  14. له في ماله أو غيره سهما أو نصيبا: নির্দিষ্ট করা
  15. عليه ضُرب: সংকীর্ণ হওয়া, অপদস্থ হওয়া
  16. ضرب عليه خراجا: চাপানো/ নির্দিষ্ট করা
  17. الشيء بالشيء: মেশানো
  18. بين القوم و غيره: পৃথক করা, দূরবর্তী করা

এছাড়াও আরো অনেক অর্থ রয়েছে। [সূত্র: আল মু’জামুল ওয়াসীত]

 

আল-কুরআনে বিভিন্ন আয়াতে ব্যবহৃত ضرب শব্দের অর্থ:

এবার আসা যাক লেখক যে আয়াতসমূহের সূত্র দিয়েছেন, সেগুলোর প্রসঙ্গে:

লেখক প্রথমে উল্লেখ করেছেন ভ্রমণ বা চলে যাওয়া অর্থে ব্যবহৃত আয়াতগুলোকে। আমরা আয়াতগুলো লক্ষ্য করি।

  • إِذَا ضَرَبُوا فِى ٱلْأَرْضِ – ৩:১৫৬
  • ضَرَبْتُمْ فِى ٱلْأَرْضِ – ৪:১০১
  • وَءَاخَرُونَ يَضْرِبُونَ فِى ٱلْأَرْضِ -৭৩:২০
  • لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبا فِى ٱلْأَرْضِ – ২:২৭৩

এখানে ৩৮:৪৪ নম্বর আয়াতটি এই অর্থে আসে নি। তাই আমরা উল্লেখ করি নি। লেখক হয়ত ভুলবশত উল্লেখ করেছেন। বাকী আয়াতাংশগুলো লক্ষ্য করুন। সবগুলোতে ‘في الأرض’ রয়েছে। এবার আমাদের অর্থের তালিকায় ৪র্থ নম্বরটি পুনরায় দেখুন। في الأرض: দূরে যাওয়া/ সফর করা। জ্বি, في الأرض থাকার কারণেই এখানে সফর, ভ্রমণ বা চলে যাওয়ার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

এরপর লেখক আঘাত করার অর্থে ব্যবহৃত আয়াতগুলোকে একত্রিত করেছেন। পূর্বের ৩৮:৪৪ আয়াতটিও এখানে আসবে। এবং পরে প্রহার অর্থের আয়াতগুলোকে এনেছেন। যদিও আঘাত ও প্রহারে ব্যবহৃত আয়াতগুলোর আরবী প্যাটার্ন একই। বাংলায় আমরা মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ইচ্ছাকৃত আঘাতকে প্রহার বলি, তবে আরবীতে আঘাত আর প্রহার কাছাকাছি। যাহোক আয়াতগুলো দেখি:

  • فَقُلْنَا ٱضْرِب بِّعَصَاكَ ٱلْحَجَرَ – ২:৬০
  • فَقُلْنَا ٱضْرِبُوهُ بِبَعْضِهَا – ২:৭৩
  • أَنِ ٱضْرِب بِّعَصَاكَ ٱلْحَجَرَ – ৭:১৬০
  • فَٱضْرِبُوا فَوْقَ ٱلْأَعْنَاقِ – ৮:১২
  • فَٱضْرِبْ لَهُمْ طَرِيقا فِى ٱلْبَحْرِ  - ২০:৭৭
  • وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ – ২৪:৩১
  • أَنِ ٱضْرِب بِّعَصَاكَ ٱلْبَحْرَ – ২৬:৬৩
  • فَرَاغَ عَلَيْهِمْ ضَرْبۢا بِٱلْيَمِينِ – ৩৭:৯৩
  • فَإِذَا لَقِيتُمُ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا فَضَرْبَ ٱلرِّقَابِ – ৪৭:৪
  • وَخُذْ بِيَدِكَ ضِغْثا فَٱضْرِب بِّهِۦ وَلَا تَحْنَثْ – ৩৮:৪৪
  • وَلَوْ تَرَىٰٓ إِذْ يَتَوَفَّى ٱلَّذِينَ كَفَرُوا ۙ ٱلْمَلَـٰٓئِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَـٰرَهُمْ – ৮:৫০
  • يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَـٰرَهُمْ – ৪৭:২৭

এখানে ২০:৭৭ ও ২৪:৩১ আয়াত দুটি ‘আঘাত’ অর্থে আসে নি। বাকীগুলোর ক্ষেত্রে অন্য কোনো প্যাটার্নে না মেলার কারণে সবচেয়ে কমন অর্থ, যা তালিকায় ১১ নম্বরে আছে, আঘাত বা প্রহার, অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সাধারণত ضرب -র সাথে কোনো মাফয়ুল বা object আসলেই এই অর্থ হয়, যদি অন্য কোনো প্যাটার্নে না পড়ে।

এরপর লেখক ‘উপস্থাপন করা’ শিরোনামে দুটো আয়াত এনেছেন। যদিও আয়াত দুটোতে এই অর্থে আসে নি। প্রথম আয়াতে ৪৩:৫৮ উদাহরণ দেয়ার অর্থে এসেছে। তালিকায় ১২ নম্বরে له مثلا এর সাথে মেলার কারণে।

وَقَالُوٓا ءَأَـٰلِهَتُنَا خَيْرٌ أَمْ هُوَ ۚ مَا ضَرَبُوهُ لَكَإِلَّا جَدَلۢا ۚ بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ

এবং বলল, আমাদের উপাস্যরা শ্রেষ্ঠ, না সে? তারা আপনার সামনে যে উদাহরণ উপস্থাপন করে তা কেবল বিতর্কের জন্যেই করে। বস্তুতঃ তারা হল এক বিতর্ককারী সম্প্রদায়।

আর ৫৭:১৩ আয়াতটিতে পৃথকীকরণ অর্থে। যা তালিকায় ১৮ নং এ এসেছে।

يَوْمَ يَقُولُ ٱلْمُنَـٰفِقُونَ وَٱلْمُنَـٰفِقَـٰتُ لِلَّذِينَ ءَامَنُوا ٱنظُرُونَا نَقْتَبِسْ مِن نُّورِكُمْ قِيلَ ٱرْجِعُوا وَرَآءَكُمْ فَٱلْتَمِسُوا نُورا فَضُرِبَ بَيْنَهُم بِسُورٍۢ لَّهُۥ بَابٌۢ بَاطِنُهُۥ فِيهِ ٱلرَّحْمَةُ وَظَـٰهِرُهُۥ مِن قِبَلِهِ ٱلْعَذَابُ

যেদিন কপট বিশ্বাসী পুরুষ ও কপট বিশ্বাসিনী নারীরা মুমিনদেরকে বলবেঃ তোমরা আমাদের জন্যে অপেক্ষা কর, আমরাও কিছু আলো নিব তোমাদের জ্যোতি থেকে। বলা হবেঃ তোমরা পিছনে ফিরে যাও ও আলোর খোঁজ কর। অতঃপর উভয় দলের মাঝখানে খাড়া করা হবে একটি প্রাচীর, যার একটি দরজা হবে। তার অভ্যন্তরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে আযাব।

এরপর ‘উদাহরণ, প্রতীক, দৃষ্টান্ত দেয়া অর্থে কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করেছেন। সবগুলো ১২ নং প্যাটার্নে এসেছে। তাই এ অর্থ হয়েছে।

  • أَلَمْ تَرَ كَيْفَ ضَرَبَ ٱللَّهُ مَثَلا كَلِمَة طَيِّبَة كَشَجَرَةٍۢ طَيِّبَةٍ -১৪:২৪
  • وَضَرَبْنَا لَكُمُ ٱلْأَمْثَالَ -১৪:৪৫
  • ضَرَبَ ٱللَّهُ مَثَلا عَبْدا مَّمْلُوكا لَّا يَقْدِرُ عَلَىٰ شَىْءٍۢ وَمَن رَّزَقْنَـٰهُ مِنَّا رِزْقا حَسَنا -১৬:৭৫
  • وَضَرَبَ ٱللَّهُ مَثَلا رَّجُلَيْنِ أَحَدُهُمَآ أَبْكَمُ لَا يَقْدِرُ عَلَىٰ شَىْءٍۢ -১৬:৭৬
  • وَٱضْرِبْ لَهُم مَّثَلا رَّجُلَيْنِ جَعَلْنَا لِأَحَدِهِمَا جَنَّتَيْنِ مِنْ أَعْنَـٰبٍۢ وَحَفَفْنَـٰهُمَا بِنَخْلٍۢ وَجَعَلْنَا بَيْنَهُمَا زَرْعا -১৮:৩২
  • وَٱضْرِبْ لَهُم مَّثَلَ ٱلْحَيَوٰةِ ٱلدُّنْيَا -১৮:৪৫
  • وَيَضْرِبُ ٱللَّهُ ٱلْأَمْثَـٰلَ لِلنَّاسِ -২৪:৩৫
  • ضَرَبَ لَكُم مَّثَلا مِّنْ أَنفُسِكُمْ -৩০:২৮

লেখক এখানে ১৪:১১২ একটি সূত্র উল্লেখ করেছেন। হয়ত ভুলবশত। কারণ ১৪ নং সূরা, সূরা ইবরাহীম। আয়াত সংখ্যা মাত্র ৫২।

এরপর লেখক দুর্দশা পতিত হওয়া অর্থে একটি আয়াত উল্লেখ করেছেন।

  • وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ ٱلذِّلَّةُ وَٱلْمَسْكَنَةُ -২:৬১

তবে এটি ১৫ নম্বরে থাকা ضُرب عليه: সংকীর্ণ হওয়া, অপদস্থ হওয়া প্যাটার্নে এসে এই অর্থ হয়েছে।

এরপর ‘ঢেকে দেয়া অর্থে উল্লেখ করেছেন:

  • فَضَرَبْنَا عَلَىٰٓ ءَاذَانِهِمْ فِى ٱلْكَهْفِ سِنِينَ عَدَدا -১৮:১১

এটি ১০ নং প্যাটার্নে সাথে মিলে এই অর্থ দিয়েছে। على المكتوب وغيره: সীল বা মোহর মারা, ঢেকে দেয়া।

এরপর পার্থক্য করা অর্থে উল্লেখ করেছেন।

  • كَذَ‌ٰلِكَ يَضْرِبُ ٱللَّهُ ٱلْحَقَّ وَٱلْبَـٰطِلَ ১৩:১৭

তবে এটা পার্থক্য করা অর্থে আসে নি। এখানে مثلا উহ্য রয়েছে, ফলে দৃষ্টান্ত/ উদাহরণ অর্থে এসেছে। আয়াতাংশের অর্থ:

আল্লাহ এভাবেই সত্য ও মিথ্যার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন.. [তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন]

আর সর্বশেষ উল্লেখ করেছেন ফেরত নেওয়া অর্থে:

  • أَفَنَضْرِبُ عَنكُمُ ٱلذِّكْرَ صَفْحا أَن كُنتُمْ قَوْما مُّسْرِفِينَ ৪৩:৫

এটি ৭ নং عن الأمر: বিরত থাকা অর্থে এসেছে।

সারাংশ: আল-কুরআনে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ আরবী ব্যকরণ ও ব্যবহারনীতি মেনেই ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে যে কোনো শব্দকে যে কোনো অর্থ করার কোনো সুযোগ নেই।

 

বিভিন্ন প্রসিদ্ধ তাফসীরে উক্ত আয়াতে ضرب-র যে অর্থ করা হয়েছে:

প্রসিদ্ধ তাফসীরগ্রন্থ তাফসীরে ইবনে কাসীরে এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে:

وقوله: { وَاضْرِبُوهُنَّ } (3) أي: إذا لم يَرْتَدِعْن (4) بالموعظة ولا بالهجران، فلكم أن تضربوهن ضربا غير مبرح، كما ثبت في صحيح مسلم عن جابر عن النبي صلى الله عليه وسلم: أنه قال في حجة الوداع: “واتَّقُوا اللهَ في النِّساءِ، فإنهن عندكم عَوَانٌ، ولكم عليهن ألا يُوطِئْنَ فُرُشكم أحدا تكرهونه، فإن فَعَلْن فاضربوهن ضَرْبا غير مُبَرِّح، ولهن رزْقُهنَّ وكِسْوتهن بالمعروف” (5) .

وكذا قال ابن عباس وغير واحد: ضربا غير مبرح. قال الحسن البصري: يعني غير مؤثر. قال الفقهاء: هو ألا يكسر فيها عضوا ولا يؤثر فيها شيئا.

(তাদেরকে প্রহার করো) অর্থাৎ, যদি তারা সদুপদেশ ও পরিত্যাগের কারণে (প্রথম দুটো ধাপে) বিরত না হয়, তাহলে তাদেরকে এমন হালকা প্রহার করতে পারো যা ভায়োলেন্ট নয়। যেমনটি সহীহ মুসলিমে রয়েছে, জাবের রা. এর বর্ণনায়, রাসূল স. বিদায় হজ্জ্বে বলেন,

নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তারা তোমাদের সহযোগী। তাদের ওপর তোমাদের অধিকার হলো, তারা তোমাদের বিছানায় এমন কাউকে জায়গা দেবে না যাকে তোমরা অপছন্দ করো। যদি দেয়, তাহলে হালকা প্রহার করো। আর তাদের অধিকার হলো ন্যায়সঙ্গত রিযিক ও পোশাক-পরিচ্ছদ।

অনুরূপভাবে ইবনে আব্বাস রা. ও একাধিক ব্যক্তি বলেন, হালকা প্রহার। হাসান বসরী রহ. বলেন, অর্থাৎ, যার কোনো দাগ পড়ে না। ফকীহগণ বলেন, যেন কোনো অঙ্গহানী না হয় এবং কোনো দাগ না পড়ে।

তাফসীরে রূহুল মায়ানীতে বলা হয়:

واضربوهن يعني ضرباً غير مبرح كما أخرجه ابن جرير عن حجاج عن رسول الله صلى الله عليه وسلم وفسر غير المبرح بأن لا يقطع لحماً ولا يكسر عظماً . وعن ابن عباس أنه الضرب بالسواك ونحوه ،

তাদেরকে পহার করো, অর্থাৎ হালকাভাবে। যেমনটি ইবনে জারীর -> হাজ্জাজ থেকে -> তিনি রাসূল স. থেকে বর্ণনা করেন, এবং ব্যাখ্যা করেন, নন-ভায়োলেন্ট (হালকা), যেন কোনো গোশতা না কাটে, হাড্ডি না ভাঙে। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, মিসওয়াক ইত্যাদি দিয়ে প্রহার।

এই তাফসীরদ্বয় থেকে বুঝা যায় যে, আয়াতটিতে প্রহারের কথাই বলা হয়েছে। শুধু এ দুটো তাফসীরই নয়, সকল তাফসীরেই এই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সাথে সাথে প্রহারের মাত্রাও এখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

 

আয়াতের মূল মর্ম:

এবার আসুন আয়াতটিতে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ কী বলেছেন তা বিশ্লেষণ করা যাক। আল্লাহ বলেন,

পুরুষ নারীদের অভিভাবক, যেহেতু আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু পুরুষগণ নিজেদের অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে। সুতরাং সাধ্বী স্ত্রীগণ অনুগত হয়ে থাকে, পুরুষের অনুপস্থিতিতে আল্লাহ প্রদত্ত হিফাজতে (তার অধিকারসমূহ) সংরক্ষণ করে। আর যে সকল স্ত্রীর ব্যাপারে তোমরা অবাধ্যতার আশংকা কর, (প্রথমে) তাদেরকে বুঝাও এবং (তাতে কাজ না হলে) তাদেরকে শয়ন শয্যায় একা ছেড়ে দাও এবং (তাতেও সংশোধন না হলে) তাদেরকে প্রহার করতে পার। অত:পর তারা যদি তোমাদের আনুগত্য করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণের পথ খুঁজো না। নিশ্চিত জেন, আল্লাহ সকলের উপর, সকলের বড়। [নিসা: ৩৪]

তোমরা যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহ সৃষ্টির আশংকা কর, তবে (তাদের মধ্যে মীমাংসা করার জন্য) পুরুষের পরিবার হতে একজন সালিস ও নারীর খান্দান হতে একজন সালিস পাঠিয়ে দেবে। তারা দু’জন যদি মীমাংসা করতে চায়, তবে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে জ্ঞাত এবং সর্ববিষয়ে অবহিত। [নিসা: ৩৫] [অনুবাদ: তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন]

আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তায়ালা মূলত পারিবারিক ব্যবস্থাপনা (Family Management) নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রথমে তিনি পুরুষকে পরিবারের ব্যবস্থাপক (Manager) উল্লেখ করেন এবং এর পেছনে যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। প্রথম যুক্তি হলো, এটা আল্লাহরই দেয়া সম্মান, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন। কাজেই এখানে প্রশ্ন তোলার কিছু নেই। দ্বিতীয় যুক্তি হলো, তারা পরিবারের জন্য খরচ করে থাকেন। সারকথা, পুরুষ ব্যবস্থাপক, এবং ব্যবস্থাপক হিসেবে পরিবারের অরগানোগ্রামে তার র‍্যাংক ওপরে। এখন পুরুষকে ব্যবস্থাপক বলা হবে, অথচ র‍্যাংক অন্যদের সমান হবে, এমন হলে ব্যবস্থাপনা চলবে না। দুনিয়ার যে কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠানেও আমরা এর বাস্তবতা দেখতে পাই। আর শুধু ওপরের র‍্যাংক নিয়ে ব্যবস্থাপক হওয়াটাই মানুষ হিসাবে অতিরিক্ত সম্মান বা বেশি অধিকার নিশ্চিত করে না। বরং ব্যবস্থাপকের অধিকারের চেয়ে দায়িত্বের পরিধিই বেশি। একটি প্রতিষ্ঠানের অন্য দশ জন সদস্য যেভাবে শান্তিতে ঘুমাতে পারেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেভাবে প্রশান্ত ঘুম ঘুমাতে পারেন না। এজন্যই আরবীতে বলা হয়, سيد القوم خادمهم নেতা হলেন সেবক।

আয়াতের পরের অংশে ব্যবস্থাপনার কৌশল উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে মূলত সাধারণভাবে চারটি ধাপ উল্লেখ করা হয়েছে। এবং পারিবারিক সমস্যাটি নারী থেকে সূচিত হয়েছে ধরেই ধাপগুলো বর্ণনা করা হয়েছে। কারণ সাধারণত ব্যবস্থাপক পুরুষ হন বিধায় যে কোনো পরিস্থিতি সাধারণত তিনি ধৈর্য্য ও দূরদর্শিতার সাথে মোকাবিলা করেন। পক্ষান্তরে নারী অনেক সময়ই সে ধৈর্য্য ধরতে না পেরে আবেগের কাছে পরাজিত হন। (ব্যতিক্রম অবশ্যই আছেন।) যাহোক, ধাপগুলো হলো:

১. প্রথম ধাপ হলো বুঝানো, কল্যাণের কথা বলা, সদুপদেশ দেয়া। স্ত্রীকে ভালবাসার সাথে কনসাল্টেন্সি দেয়া। উপদেশটা কী হবে, তা আয়াতের আগের অংশে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, সাধ্বী স্ত্রীগণ অনুগত হয়ে থাকে, পুরুষের অনুপস্থিতিতে আল্লাহ প্রদত্ত হিফাজতে (তার অধিকারসমূহ) সংরক্ষণ করে। অর্থাৎ তারা আল্লাহর হুকুম আহকাম ঠিকমতো পালন করেন, আবার পারিবারিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তারা অর্গানোগ্রাম মেনে স্বামীর আনুগত্য করেন। এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে স্ত্রী হিসেবে আমানতের হেফাজত করেন।

২. মানুষের মেজাজ বহুরূপী। একেকজন একেক রকম। প্রথম ধাপে সবার ক্ষেত্রে কাজ হবে এমনটি নয়। তাই দ্বিতীয় ধাপে শয্যা ভিন্ন করা হবে। এক্ষেত্রে আবার একাধিক ধাপ উলামায়ে কিরাম উল্লেখ করেছেন। প্রথমে একই খাটে আলাদা শুবে, এরপর একজন খাটে, আরেকজন নিচে, অর্থাৎ একই রুমে তবে একেবারে ভিন্ন। এরপর ভিন্ন রুমে, এরপর ভিন্ন বাসায় (যেমন স্ত্রীকে কিছুদিন পিতৃলয়ে পাঠানো যেতে পারে)। শয্যা আলাদা করা পারিবারিক সমস্যা সমাধানের অত্যন্ত কার্যকর উপায়। দূরে থাকার কারণে স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে মিস করেন এবং এতে ভালবাসা বৃদ্ধি পায়। প্রত্যেকে নিজের ভুলগুলো বুঝতে পারেন, যা একসঙ্গে থাকলে হয় না।

৩. ক্লাসের সব ছাত্র একরকম নয়। কাউকে বুঝিয়ে বললেই হয়, কাউকে চোখ রাঙাতে হয়, আবার কাউকে কান ধরে উঠবস করাতে হয়। কাউকে আবার বেত দিয়ে প্রহারও করতে হয়। ইসলাম সর্বযুগের, সর্বকালের, সব রকম মানুষের জন্য প্রযোজ্য। তাই তৃতীয় ধাপে স্বামী নিরুপায় হলে স্ত্রীকে প্রহার করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, প্রহার করার অনুমতি দেয়া আর প্রহার করা পছন্দ করা এক নয়। আল্লাহ তালাকের বিধান দিয়েছেন, কিন্তু হাদীসে এসেছে, তালাক হলো সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল। অর্থাৎ অনুমতি আছে, তবে যত্রতত্র ব্যবহারের সুযোগ নেই, নিতান্ত প্রয়োজনে ব্যবহার করা যেতে পারে, সীমিত উপায়ে।

রাসূল স. তাঁর কোনো স্ত্রী তো দূরের কথা, কোনো সেবককেও প্রহার করেন নি। আনাস রা. বলেন, আমি নবীজীর স. সেবা করেছি দশ বছর। তিনি কখনো আমাকে প্রহার করেন নি, গালি দেননি, উফ-ও বলেন নি (বিরক্তি প্রকাশ করেন নি)। এমনকী কোনো কাজ করলে বলেন নি, কেন করলে? বা না করলে বলেন নি, কেন করলে না?

রাসূল স. বলেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে-ই যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম। আর আমি তোমাদের মধ্য হতে আমার স্ত্রীদের কাছে সর্বোত্তম। তিনি আরো বলেন, তোমাদের ভালোরা (স্ত্রীদের) প্রহার করতে পারে না।

এসব হাদীসের আলোকে বুঝা যায়, প্রহারের অনুমতি সীমিত পর্যায়ে দেয়া হয়েছে, তবে তা শুধু ক্রোধ প্রকাশের জন্য। অর্থাৎ স্ত্রী হয়ত প্রথম দুটো ধাপেও বুঝতে সক্ষম হচ্ছে না যে, স্বামী তার ওপর ক্রোধান্বিত, তাই এর মাধ্যমে তাকে সে বুঝটি দেয়ার চেষ্টা করা হবে।

তবে এই প্রহার যেন চেহারায় বা দৃশ্যমান কোনো স্থানে না হয়, যেন তা মারাত্মক না হয়, বরং একেবারে সীমিত পর্যায়ের হয়, সে হুশিয়ারিও হাদীসে এসেছে।

সবমিলিয়ে এই আয়াতে প্রহারের ব্যাপারটা আল্লাহ তায়ালার মর্যাদার সাথে মোটেও বেমানান নয়। বরং, তাঁর সুদূর প্রজ্ঞারই এক অনুপম নিদর্শন।

৪. চতুর্থ ধাপে, যখন স্বামী-স্ত্রী নিজেরা সমস্যার সমাধান করতে পারছে না, তখন দুই পরিবারের একজন করে মোট দুজনকে সালিস নিয়োগ করতে বলা হয়েছে। আল্লাহ চাইলে তারা হয়ত একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারবেন।

উল্লেখ্য, সমস্যাটি যদি পুরুষের সাইডে হয়, অর্থাৎ পারিবারিক গণ্ডগোলের জন্য দায়ী স্বামী হন, তখন স্ত্রী এক ও দুই নং ধাপ ব্যবহার করে সরাসরি চতুর্থ ধাপে চলে আসতে পারেন। এবং প্রয়োজনে স্বামীর কাছ থেকে খুলা তালাক নিতে পারেন, যা অন্যত্র বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।

 

আরো সংশয়?:

আমরা এবার লেখকের লেখায় ফিরে যাই।

অনেকে বলেন, দা-রা-বা এর একটি অর্থ যেহেতু “আঘাত করা” হয়, তাহলে কেন স্ত্রীদেরকে আঘাত করা যাবে না। লক্ষ্য করুন, যতগুলো আয়াতে আল্লাহ ﷻ আঘাত করতে বলেছেন, তার প্রত্যেকটি আয়াতে তিনি পরিস্কার করে বলে দিয়েছেন কী দিয়ে বা কোথায় আঘাত করতে হবে। ২:৬০, ৭:১৬০, ২৬:৬৩ بِّعَصَاكَ লাঠি দিয়ে, ২:৭৩ بِبَعْضِهَا একটি অংশ দিয়ে, ৮:১২ فَوْقَ الْأَعْنَاقِ ঘাড়ের উপরে, ২০:৭৭ فِي الْبَحْرِ নদীতে, ২৪:৩১ بِأَرْجُلِهِنَّ পা দিয়ে, ৩৭:৯৩ بِالْيَمِينِ ডান হাত দিয়ে, ৪৭:৪ الرِّقَابِ ঘাড়ে। প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ ﷻ পরিস্কার করে বলে দিয়েছেন “কী দিয়ে” বা “কোথায় আঘাত” হবে। তাই ৪:৩৪–এ স্ত্রীদেরকে “আঘাত কর” হতে পারে না কারণ আল্লাহ ﷻ বলেন নি কী দিয়ে আঘাত করতে হবে বা কোথায় আঘাত করতে হবে। আল্লাহ কু’রআনে কোনো বিভ্রান্তি রাখেন না, যেন মানুষ নিজের ইচ্ছা মত অর্থ করে নিতে পারে। এরপরেও যদি কেউ দাবি করেন যে এই আয়াতে আঘাত করাই হবে, তবে এটি হবে একমাত্র আয়াত যেখানে আল্লাহ ﷻ কী দিয়ে বা কোথায় আঘাত করতে হবে তা সুস্পষ্ট করে বলেন নি।

যেমনটি আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি, ضرب –র সবচেয়ে কমন অর্থ প্রহার করা। যদি অন্য কোনো প্যাটার্নে মিলে, তাহলে সে অনুযায়ী অর্থ হবে। আরবী ব্যকরণে এটাই সিদ্ধ। এবং হাদীসে প্রহারের মাত্রা ও প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয় আসাতে বুঝা যায় যে আয়াতে এই অর্থেই এসেছে। তাছাড়া এই আয়াতের শানে নুজুলেও এক সাহাবী কর্তৃক তাঁর স্ত্রীকে প্রহারের ঘটনা আছে। ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখারীতে বিবাহ অধ্যায়ে একটি পরিচ্ছদ উল্লেখ করেন। শিরোনাম দেন:

ما يكره من ضرب النساء وقول الله واضربوهن أي ضربا غير مبرح

স্ত্রীকে প্রহার করা অপছন্দনীয় এবং আল্লাহর বাণী “তাদেরকে প্রহার করো” অর্থ কঠিন প্রহার নয় (বরং, হালকা প্রহার)।

এই পরিচ্ছদে ইমাম বুখারী রহ. যে হাদীসটি উল্লেখ করেন, তাতে রাসূল স. বলেন, তোমাদের কেউ যেন তার স্ত্রীকে দাসের মতো প্রহার না করে, আবার দিন শেষে গিয়ে মিলিত হয়। অর্থাৎ প্রহার করা এবং রোমান্স করা পরস্পর বিপরীতধর্মী কাজ। রাসূল স. তা অপছন্দ করেছেন। [বুখারী: ৪৯০৮]

এ হাদীস ও ইমাম বুখারী রহ. -এর পরিচ্ছদের নামকরণেই সুস্পষ্ট হয় যে, আয়াতে ‘প্রহার’ই উদ্দেশ্য। আর ওপরে প্রসিদ্ধ দুটো তাফসীরের আলোচনা তো হয়েছেই।

লেখক লিখেছেন, এখানে ‘কোথায় আঘাত’ হবে তা উল্লেখ করা হয় নি। অর্থাৎ مفعول বা object উল্লেখ হয়নি। অথচ এখানে هن উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি আরো লিখেন,

অনেকে দাবি করেন যে, যখন ’দারাবা’ এর সাথে অন্য কোনো শব্দ যুক্ত হয় এবং তারা একসাথে একটি বাক্যাংশের রুপে ব্যাবহার হয়, তখনি শুধুমাত্র দারাবা এর অর্থ প্রহার না হয়ে অন্য কিছু হবে। যেমন দারাবা মাছালা অর্থ ‘উদাহরণ দেওয়া’, দারাবা আ’লা অর্থ ’ঢেকে দেওয়া’। যদি দারাবা এর সাথে অন্য কোনো শব্দ যুক্ত না হয়, শুধুই যদি দারাবা ক্রিয়াবাচক শব্দটি থাকে, তাহলে দারাবা অর্থ হবে ‘প্রহার করা’ এবং কাকে প্রহার করতে হবে তা মাফুউ’ল বিহি অর্থাৎ ক্রিয়া পদের উদ্দেশ্য হিসেবে আসবে। যদি এই নিয়ম অনুসরণ করি আমরা, তাহলে ১৩:১৭ আয়াতে কী হয় দেখুন—
… এভাবে আল্লাহ প্রহার করেন সত্য এবং মিথ্যা। (১৩:১৭)
এটি অর্থহীন। এখানে দা-রা-বা নিশ্চিতভাবে ‘পার্থক্য করা’ / ‘আলাদা করা’ হবে।

পূর্বে যেমনটি আলোচনা করা হয়েছে, ১৩:১৭ নং আয়াতে প্রহার বা পার্থক্য করা অর্থে আসে নি। সেখানে مثلا উহ্য রয়েছে, ফলে দৃষ্টান্ত/ উদাহরণ অর্থে এসেছে। আরবী এমন অনেক ব্যবহারে শব্দ উহ্য থাকে। এটাও মনগড়াভাবে বসানোর সুযোগ নেই। বরং শব্দ ও বাক্যের পূর্বাপর দেখে বুঝে নেয়া যায়। প্রহার বা পৃথকীকরণ অর্থ করা হলে আয়াতটির মর্মহীন হয়ে যায়। আয়াতাংশের অর্থ:

আল্লাহ এভাবেই সত্য ও মিথ্যার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন.. [তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন]

এটি যে দৃষ্টান্ত অর্থে এসেছে, তা কয়েকটি তাফসীর গ্রন্থ থেকে প্রমাণ করা হলো:

১. ইবনে কাসীর: اشتملت هذه الآية الكريمة على مثلين مضروبين للحق في ثباته وبقائه، والباطل في اضمحلاله وفنائه

{ كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْحَقَّ وَالْبَاطِلَ } أي: إذا اجتمعا لا ثبات للباطل ولا دوام له، كما أن الزبد لا يثبت مع الماء، ولا مع الذهب ونحوه مما يسبك في النار، بل يذهب ويضمحل؛

২. আইসারুত তাফাসীর: ما زال السياق في تقرير التوحيد والتنديد بالكفر والشرك ففي هذه الآية الكريمة ضرب الله تعالى مثلاً للحق والباطل ، للحق في بقائه ، والباطل في اضمحلاله وتلاشيه

৩. বাইজাভী: { كذلك يَضْرِبُ الله الحق والباطل } مثل الحق والباطل فإنه مثل الحق في إفادته وثباته بالماء الذي ينزل من السماء فتسيل به الأودية على قدر الحاجة والمصلحة فينتفع به أنواع المنافع ، ويمكث في الأرض بأن يثبت بعضه في منافعه ويسلك بعضه في عروق الأرض إلى العيون والقنى والآبار ، وبالفلز الذي ينتفع به في صوغ الحلى واتخاذ الأمتعة المختلفة ويدوم ذلك مدة متطاولة ، والباطل في قلة نفعه وسرعة زواله بزبدهما

বাকী অংশে লেখক অনেকে যা দাবী করেন বলে জানিয়েছেন, মূলত ব্যাকরণ এটাই। ১৩:১৭ আয়াতটির অর্থ ভিন্ন হওয়ার কারণ প্যাটার্ন ভিন্ন হওয়া।

…এই দুটি আয়াত থেকে পরিস্কার ভাবে বোঝা যায় নারীদের সম্পর্কে আল্লাহর ﷻ সিদ্ধান্ত কী। নারীদের প্রতি এত সুন্দর সহমর্মিতার নির্দেশ যিনি দেন, তিনি কীভাবে তাদেরকেই প্রহার করার কথা বলতে পারেন?

আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, আল্লাহ তায়ালার নারীদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের নির্দেশের সাথে আলোচ্য আয়াতের প্রহারের অনুমতির কোনো বৈপরিত্ব নেই। কাজেই ভুল বুঝার কোনো সুযোগ নেই।

৪:৩৪ যে স্ত্রীদেরকে প্রহার করতে বলে না বরং আলাদা করে দিতে বলে তার সমর্থনে ঠিক এর পরের আয়াতটি ৪:৩৫ দেখুনঃ

আর যদি তোমরা(২+) তাদের দুজনের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কর, তাহলে পুরুষের পক্ষ/পরিবার থেকে একজন মধ্যস্থতাকারী এবং স্ত্রীর পক্ষ/পরিবার থেকে একজন মধ্যস্থতাকারী নিযুক্ত কর। যদি তারা উভয়ে (মধ্যস্থতাকারী) মিটমাট করতে চায়, তাহলে আল্লাহ তাদের দুজনের মধ্যে মিটমাটের ব্যবস্থা করে দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সবকিছু সম্পর্কে অবগত। (৪:৩৫)

স্বামী যদি স্ত্রীকে প্রহার করেই সমস্যার সমাধান করতে পারে, তাহলে কী দরকার এত কষ্ট করে দুই পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারী এনে সালিস করার? স্ত্রীদেরকে প্রহার করে বশ করিয়ে রাখলেই তো হল। প্রহার করার পড়ে অভিভাবক ডেকে এনে মধ্যস্থতা করা যুক্তিযুক্ত, নাকি প্রহার করার আগে অভিভাবক ডেকে এনে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করা উচিত?

৪:৩৫ এ আল্লাহ তায়ালা নিজেদের মধ্যে মীমাংসা না হওয়া অবস্থায় তৃতীয় পক্ষের শরাণাপন্ন হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এটি চতুর্থ ধাপ। আলাদা হওয়ার কথা ৪:৩৪ এ দ্বিতীয় ধাপে উল্লেখ করা হয়েছে। আয়াতে শব্দ এসেছে اهجروهن । হিজরাহ অর্থ ত্যাগ করা। ত্যাগের আবার কয়েকটি পর্যায় রয়েছে যা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি।

দ্বিতীয় ধাপের পর তৃতীয় ধাপেও ত্যাগের কথা বলা হলে দ্বিতীয় ধাপের স্বার্থকতা থাকে না। আর আলাদা করা বলতে চূড়ান্ত আলাদা করার কথা বলা হলে (তালাকের কথা বলা হলে) ৪:৩৫ এ সালিসের কোনো যথার্থতা বাকী থাকে না। সালিস হবে তালাকের আগে, পরে না। তালাক যদি হয়ে যায়, তখন সালিস কেবল তখনই কার্যকর হতে পারে যখন তালাক এক তালাক হবে এবং প্রতাবর্তনের ক্ষমতাসম্পন্ন হবে। এটা ভিন্ন আলোচনা। মোটকথা লেখকের দাবীটি সঠিক নয়।

লেখকের লেখার বাকী অংশের উত্তর আমাদের ওপরের আলোচনায় চলে এসেছে। তাই আর কোনো অংশ উদ্ধৃত করা প্রয়োজন মনে হয় নি।

 

উপসংহার:

১. প্রহার করার অনুমতি মানেই প্রহার করার নির্দেশ নয়। আল্লাহ তায়ালা জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইনসাফ বা ন্যায় চর্চা করতে বলেছেন। কারো ওপর অন্যায় শুধু ব্যক্তিকেই কষ্ট দেয় না, মহান আল্লাহ তাতে নাখোশ হন। এবং কিয়ামতের দিন তিনি মজলুম ব্যক্তিকে জুলুমের প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ করে দিবেন। চাইলে মজলুম ব্যক্তি জালিম ব্যক্তির সওয়াবও বিনিময় হিসেবে নিতে পারবে। কাজেই, পৃথিবীর সকল জুলুমেরই হিসাব হবে, কোনো জুলুমই বাদ পড়বে না।

২. যারা স্ত্রীকে প্রহার করেন, তারা কেউ কুরআনের এই আয়াত থেকে শিক্ষা নিয়ে স্ত্রীকে প্রহার করেন না। মদ-গাঁজা-নেশা ও পরকীয়া এসব পেছনে থাকে। আল-কুরআনকে কেউ সত্যিই অনুসরণ করলে তার পক্ষে কখনো স্ত্রীর ওপর জুলুম করা সম্ভব নয়।

৩. আল-কুরআন আমাদের জীবন চলার ম্যানুয়াল। আমাদের স্রষ্টা আল্লাহ, আমাদের সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি এবং সবচেয়ে সম্পূরকভাবে জানেন একমাত্র তিনি। আমাদের চলার পথের কোনো সমস্যাই তাঁর অজানা নয়। তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বাইরে জগতের কোনো সমস্যা নেই। তিনি আমাদের জন্য যা যেভাবে ভালো, তা সেভাবেই বর্ণনা করেছেন।

তাঁর এ ম্যানুয়াল যেভাবে একটি সভ্য জাতিকে পথ দেখাবে, সেভাবে একটি সভ্যতার উৎকর্ষতা বঞ্চিত জাতিকেও দিশা দিবে। সবাই যার যার জায়গায় তা থেকে দিক-নির্দেশনা খুঁজে নেবে। কাজেই কোনো কারণে আমাদের সীমিত জ্ঞানে তাঁর কোনো নির্দেশের পেছনে অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা বুঝতে না পারলে, তিনি এমনটি বলেন নি মনে করা সঠিক নয়।

৪. আল-কুরআন আরবী ভাষায় নাজিল হয়েছে। রাসূল স. যে বংশে জন্ম নিয়েছেন, তাদের ভাষাও ছিল আরবী। রাসূলের স. প্রায় সকল সাহাবী আরব ছিলেন। তাঁরা আরবী বুঝতেন। আরবী সাহিত্য, কাব্য ইত্যাদি তাদের নখদর্পণে ছিল। আরবী কোনো শব্দ তাদের কাছে অস্পষ্ট ছিল না। কোনো কারণে কোনো আয়াতের মর্ম অস্পষ্ট হলে তারা তা রাসূল স. কে জিজ্ঞাসা করে নিতেন, এবং সে অনুযায়ীই বর্ণনা করতেন। রাসূলের স. ও তাঁর সাহাবীদের প্রস্থানের চৌদ্দশ’ বছর পরে এসে এমনটি মনে করা যে, তারা আরবী বুঝেন নি, এর চেয়ে বোকামীর কিছু হতে পারে না।

৫. আল-কুরআনকে বুঝতে হবে রাসূল স. ও তাঁর সাহাবীদের রা. চোখ দিয়ে। কুরআনের কোনো আয়াতের কোনো অর্থ যদি পূর্বের তাফসীরকারকদের অর্থের সাথে দ্বন্দপূর্ণ হয়, তাহলে তা পরিত্যজ্য। তবে পূর্বের তাফসীরগুলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিক ভাষায় কোনো আয়াতকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। পূর্বের তাফসীরগুলো থেকে বের হয়ে একেবারে মনগড়া ব্যাখ্যা করার কোনো সুযোগ নেই।

৬. মনগড়া ব্যাখ্যার সুযোগ এজন্যই বন্ধ যে, এ কারণে কুরআনের তাবৎ আহকামে পরিবর্তন আবশ্যক হবে। উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ নিকাহ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। নিকাহকে আমরা বিবাহ শব্দে অনুবাদ করি, যা দুজন নর-নারীর মাঝে একটি বিশেষ চুক্তি। কিন্তু নিকাহের শাব্দিক অর্থ হলো, মিলিত হওয়া। তো, শাব্দিক অনুবাদ দিয়ে ‘তোমরা নিকাহ করো’ আয়াতাংশটিকে ‘তোমরা নারীর সাথে মিলিত (যৌনাচারে) হও’ অর্থ করার সুযোগ থাকছে। ফলে সকল প্রকার ফ্রি-সেক্স বৈধ হয়ে যায়।

আবার সিয়ামকে আমরা রোজা বলি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিয়তসহ যাবতীয় পানাহার ও স্ত্রীর সাথে মেশা থেকে বিরত থাকাকে সিয়াম বলা হয়। তবে সিয়াম অর্থ মূলত বিরত থাকা। শাব্দিক অর্থ দিয়ে ছোট খাটো কাজে বিরত থাকার মাধ্যমেই সিয়াম পালনের দাবী করা যেতে পারে। আবার সালাত শব্দের শাব্দিক অর্থ কেউ করেছেন ‘নিতম্ব নাড়ানো’। তো, এতে কেউ সালাতকে নাচা অর্থে প্রয়োগ করতে পারেন। ইত্যাদি ইত্যাদি। কতটা ভয়ংকর ভাবা যায়!

৭. সর্বোপরি সতর্ক থাকতে হবে, আমাদের সীমিত জ্ঞান ও যুক্তি দিয়ে যেন অসীম জ্ঞানের মালিকের বাণীর কন্ট্রাডিকশন না হয়।

আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আমীন।

 

বি:দ্র:

এই পোস্টটি লেখার পর লেখক ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ জানান এবং তার নিবন্ধে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও টীকা যোগ করেন। এবং বিভিন্ন বিষয়ে লেখকের সাথে আজ পর্যন্তও আলোচনা হয়েছে ও হচ্ছে। পুরো সময়ে লেখককে সত্যানুসন্ধানীরূপে পেয়েছি, মাশা’আল্লাহ। আল্লাহ তাকে ও আমাদেরকে দ্বীনের পথে কবুল করুন। এই পোস্টের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি আক্রমণ নয়। লেখক কয়েকজনের রেফারেন্সে তার প্রবন্ধটি তৈরী করেন, এবং আমরা সেগুলোর জবাব দেয়ার চেষ্টা করি। তাই আশা করি এই পোস্টের কারণে কেউ ব্যক্তি বিদ্বেষে জড়িয়ে পড়ব না। আমরা সবাই সত্যের সন্ধানী, এবং আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর জন্যই লেখা ও জবাব দেয়া। কাজেই সত্য আসতেই সত্যকে মেনে নেয়া, নিজের জায়গা ছেড়ে দেয়া – ইনশা’আল্লাহ এসব গুন আমাদের মাঝে সবসময়ই থাকবে। আল্লাহ কবুল করুন। আমীন।

 

সংযুক্তি:

ইমাম আব্দুল্লাহ হাসান একই থিমে এ বিষয়ে একটি নিবন্ধ লিখেন। মুসলিম ম্যাটার্স তা প্রকাশ করে নিবন্ধটির প্রসঙ্গে পোস্টে উল্লিখিত লেখকে সাথে আলোচনা হয়। সেখানে আমাদের মন্তব্য ছিল এমন: “এই আর্টিকেলটি অন্যসব আর্টিকেলের ন্যায় আয়াতটির ‘ব্যাখ্যার’ পর্যায়ে পড়ে। আমরা আয়াতটি এভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি, বা বলতে পারি, আয়াতটির মর্ম এই। বলতে পারি যে, আয়াতটিতে প্রহার বলে ক্রোধ প্রকাশ বুঝানো হয়েছে। যেহেতু ক্রোধ প্রকাশের মাধ্যম তাদের কাছে প্রহার ছিল, তাই প্রহার বলা হয়েছে।

কিন্তু দা-রা-বা এর অর্থই ক্রোধ প্রকাশ, এটা আসলে বলা যায় না। যেমন ধরুন, পিতা-মাতাকে উফ বলতে কুরআনে নিষেধ করা হয়েছে। এর ব্যাখ্যা হলো, বিরক্তিমূলক অভিব্যক্তি।

এমন ব্যাখ্যা বিভিন্ন তাফসীরেও এসেছে যে, প্রহার বলতে একেবারে মৃদু প্রহার, মেসওয়াক বা আরো হালকা। বরং বলা হয়েছে, প্রহার করাটা কাপুরুষতা। রাসূল স. কখনো প্রহার করেন নি। বলেছেন, তোমাদের ভালোরা স্ত্রীকে প্রহার করতে পারে না। ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো সবই ব্যাখ্যার পর্যায়ে, বা বন্ধনীর ভেতর দেয়ার বিষয়। কিন্তু লিটেরাল অর্থে বলা যায় না। কারণ লিটেরালি দারাবা এ অর্থে ব্যবহার হয় না।

এখানে আসলে দুটো দিক। কুরআনের এ আয়াতে প্রহার করার কথা বলা হয়েছে বলেই কি প্রহার করা হবে? রাসূলের স. আমল কী ছিল, তাঁর সাহাবীদের আমল কী ছিল, সেগুলো দেখা হবে না? কুরআনের অন্য আয়াতগুলোতে কেমন আচরণের কথা বলা হয়েছে, ইত্যাদি বিষয়গুলোও আসবে। যারা প্রহার করে তারা আয়াত থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রহার করে না।

কুরআন ও হাদীসে অসংখ্য জায়গায় সদ্ব্যবহারের কথা আছে। স্ত্রীকে কুরআনে ‘যাওজ’ বলা হয়েছে। যাওজ মানে জোড়া। এক জোড়া মোজার একটি বাদে আরেকটির কোনো মূল্য নেই, এবং দুটোই সমান। তেমনি স্বামী-স্ত্রী দুজনই সমান। এককে ছাড়া অন্যজন অর্থহীন। কত চমৎকার শব্দ। স্বামী শব্দে দেবত্বের গন্ধ আছে, যাওজে তা বিলকুল নেই।

স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের লিবাস বলা হয়েছে। লিবাসকে লিটেরালি অর্থ করলে দাঁড়ায় পরিচ্ছদ। লিবাস মানুষের সম্মান, ইজ্জত, নিরাপত্তা ইত্যাদি নিশ্চিত করে। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য তা-ই।

এসব বিষয়কে ইগনোর করলে তো হবে না। সব আয়াত ও হাদীস সামনে নিয়ে ভাবতে হবে।

কুরআনের অমুসলিম গবেষকরা এমন বিষয়গুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করে ইসলামের খুঁত ধরার চেষ্টা করে, তা প্রচার করে। এক্ষেত্রে আমরা ইসলামকে বাঁচাতে মূল থেকে দূরে সরে গিয়ে যদি নতুন অর্থ দাঁড় করাতে চাই, তাহলে দ্বীনের অনেক কিছু পাল্টাতে হবে।

কমার্শিয়াল ইন্টারেস্ট যখন শুরু হলো, তখন দাবী আসল যে এটা সেই সুদ না যা হারাম করা হয়েছে। উলামায়ে কিরাম সোচ্চার হলেন। বললেন, সুদ হারাম, সর্বাবস্থায়, সর্ব প্রকার।

প্রাচীন খেঁজুর আর আঙ্গুরের মদের পরিবর্তে যখন নতুন এলকোহল আর ওয়াইন আসল, সিনথেটিক, কেমিক্যালে তৈরি, তখনও একদল গবেষক দাঁড়িয়ে গেল, যে এটা সেই মদ না। উলামায়ে কিরাম সোচ্চার হলেন, বললেন নেশাজাতীয় সব দ্রব্যই মদ।

তো, এভাবে উলামায়ে কিরাম দ্রুত সেই পয়েন্টটা ধরে ফেলেন, যেই পয়েন্টে ঢুকে চক্রান্তকারীরা দ্বীনের মেজাজ নষ্ট করতে চায়। বিষয়টা সংক্ষেপে আরজ করলাম, তবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাযাকাল্লাহ।”