দাওয়াহর ক্ষেত্রে প্রায়োরিটি নির্ধারণ

গতকাল মিরপুর দারুস সালামে “আল্লাহর পথে দাওয়াহর বাধাসমূহ ও সেগুলো দূর করার উপায় (معوقات الدعوة إلى الله و كيفية معالجتها)” শীর্ষক আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়। এতে উপস্থিত হন মিডিয়ায় ইসলামী অনুষ্ঠানসমূহের আলোচক ডক্টরবৃন্দ ও উলামায়ে কিরাম। কওমী অঙ্গন থেকে মুফতী আব্দুল মালিক সাহেব হাফিজাহুল্লাহ আগে থেকেই সিলেটে প্রোগ্রাম থাকায় আসতে পারেন নি। তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে মাওলানা জাকারিয়া আব্দুল্লাহ ভাই আসেন। এদিকে আমি ও জামিয়াতুল আস’আদের বিশিষ্ট মুফতী লুৎফুর রহমান সাহেব উপস্থিত হই। মুরুব্বী অনেক উলামায়ে কিরাম উপস্থিত হতে পারেন নি।

আলোচকদের মুখ থেকে আলহামদুলিল্লাহ অভিন্ন সুরে একই কথা উচ্চারিত হয়। তা হলো, বর্তমানে উম্মতের ঈমান খুব সংকটপূর্ণ। নানাভাবে তারা ঈমানের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। এখন আমীন আস্তে বলা হবে না জোরে, তারাবীহ বিশ রাকাত হবে না আট রাকাত, সূরা ফাতিহা পড়বে না চুপ থাকবে, রাফয়ুল ইয়াদাইন করবে না বাদ দিবে – এসব রাজিহ-মারজুহ বা উত্তম-অনুত্তমের মাসয়ালা বর্ণনায় খুব সতর্ক থাকতে হবে। এমনভাবে এগুলো বলা যে, একদলের নামায হয় নি, বাতিল বা আরো বেড়ে তারা মুশরিক -এসব নিতান্তই বাড়াবাড়ি।

আলোচনাসভায় প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. সাইফুল্লাহ সাহেব। সঞ্চালনা করেন ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর সাহেব। আলোচনায় অংশ নেন ড. মনজুরে এলাহী, ড. আবু বকর জাকারিয়া, ড. শাহেদ মাদানী, মুখতার সাহেব, ড. এবিএম হিজবুল্লাহসহ আরো অনেকে।

মাওলানা জাকারিয়া আব্দুল্লাহ ভাই প্রবন্ধের একটি অংশ উল্লেখপূর্বক আলোচনা করেন। প্রবন্ধকার দায়ী বা দ্বীন প্রচারকের অভ্যন্তরীণ একটি সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইলমের স্বল্পতা। জাকারিয়া ভাই বলেন, কেউ যদি কেবল এক পক্ষের কিতাবাদি পড়েন, অন্য পক্ষের কিতাবাদি এড়িয়ে চলেন, তাহলে এতে তার সীমাবদ্ধতা তৈরী হয়। ফলে অন্য পক্ষের সাথে স্বাভাবিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়।

আমার আলোচনায় আমি বলি, বর্তমানে দাওয়াহর ক্ষেত্রে আমাদের Priority বা গুরুত্ব নির্ধারণ করা প্রয়োজন। উম্মাহর বর্তমান প্রজন্ম এখন প্রায় সিংহভাগই ঈমানের বাইরে। কারণ ঈমান হলো ইয়াকীন বা নিশ্চিত বিশ্বাসের নাম। শাক্ক বা সন্দেহ ঈমান নয়। অথ্চ এই প্রজন্মের বেশিরভাগই সন্দেহবাদী। আর কেউ কেউ তো সরাসরি নাস্তিক।

আলোচনায় আরো বলি, হযরত আবু বকর রা. রাসূল স. এর বিদায়ের পর খিলাফতের আসনে বসলে সর্বপ্রথম যে সমস্যায় পড়েন তা হলো ইরতিদাদ বা ইসলাম ত্যাগের ফিতনা। কিন্তু খিলাফত stabilize না করে ইরতিদাদ মুকাবিলার পক্ষে সাহাবীগণ একমত ছিলেন না। আবু বকর রা. শক্তভাবে এই ফিতনার বিরুদ্ধে লড়ে যান। তাই পরবর্তীতে তাঁকে The Savior of Islam বলে অভিহিত করা হয়।

আমরা এখন যেই ফিতনার মাঝ দিয়ে যাচ্ছি, তা সেই ফিতনা থেকে অনেক ভয়াবহ। আমাদের আকাবির আসলাফ রহ., যাদের মাধ্যমে এই উপমহাদেশে আমরা দ্বীন পেয়েছি, তাঁদের সময়ের যে কোনো ফিতনার চেয়েও এটা ভয়াবহ। আমরা যদি এখনি তাওহীদ ও ঈমান প্রচারে জোর না দিই, তাহলে আগামী প্রজন্ম ইসলামের ওপর থাকবে কি না সন্দেহ।

আমাদের দ্বিতীয় গুরুত্বের দাবীদার সীরাতুন্নবী স. এর আলোচনা ও শিক্ষা। শুধু সহীহ আর দয়ীফ হাদীসের রেফারেন্স রাসূলের স. সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক তৈরী করে না। তাঁর জীবন, তাঁর ত্যাগ, তাঁর যুদ্ধ-বিগ্রহ সবকিছু ধারাবাহিকভাবে প্রজন্মের জানতে হবে। তাঁর চরিত্রের দিকে নিক্ষিপ্ত তীরগুলোর যৌক্তিক উত্তর জানতে হবে।

আর শেষ যে বিষয়টি বলেছি তা হলো, আমাদেরকে মানুষকে মসজিদমুখী হওয়ার দাওয়াত দিতে হবে। রাসূল স. কিছু হলেই মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে যেতেন, খুৎবা দিতেন। অথচ এখন মানুষ টিভিমুখী। মসজিদের ইমাম-খতীবরা তাদের চোখে শত্রু, কোথাও বা কাফির-মুশরিকও। আমরা কীভাবে দাওয়াত দিচ্ছি যে দাওয়াতের কেন্দ্র থেকেই মানুষ বের হতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করছে?

আমরা আশা করব টিভিতে আলোচনা ও প্রশ্নোত্তরের জন্য একটি গাইডলাইন প্রণয়ন করা হবে। ভিন্নমতকে শ্রদ্ধার সাথে উল্লেখ করা হবে। যেন সাধারণ মানুষ মনে না করে যে, ভিন্নমতটির কোনো দলীলই নেই। গাইডলাইন প্রণয়নে সর্বজনশ্রদ্ধেয় মুফতী আব্দুল মালিক সাহেব হাফিজাহুল্লাহ বা তাঁর প্রতিনিধিদের সাথে রাখতে হবে। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

যতদূর জেনেছি, আলহামদুলিল্লাহ দরদমাখা আবেগী এ কথাগুলো অনেকের মাঝে চিন্তার খোরাক দিয়েছে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ছোট খাটো মতপার্থক্যের মাঝেও বৃহত্তর স্বার্থে উপকারীভাবে দাওয়াহর কাজ করার তাওফীক দিন। আমীন।