হজ্জ্বের অর্থনৈতিক ভূমিকা

হজ্জ্ব ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। অফুরান সাওয়াব লাভের ইবাদত হজ্জ্ব। ইবাদত ছাড়াও অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে হজ্জ্বের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।

১. সেই সপ্তম শতাব্দী থেকে প্রায় হাজার বছর ধরে হজ্জ্বকে কেন্দ্র করে মুসলিমরা ভূমধ্যসাগর ও ভারত মহাসাগর কেন্দ্রিক অর্থনীতির মাঝে লিংক বজায় রেখেছিল। যা পশ্চিমারা ধরতে পেরেছে হাজার বছর পর।

ভারত মহাসাগর দিয়ে এদিক থেকে যেত মরিচ, মশলা ইত্যাদি। ওদিক থেকে আসত তুলা ও অন্যান্য জিনিস। এভাবে বিশ্বঅর্থনীতির নেটওয়ার্ক ছিল হজ্জ্ব।

২. হজ্জ্ব মূলত পৃথিবীর চতুর্দিক থেকে লাখ লাখ মুসলিমকে সমবেত করে। আর হজ্জ্বের সময় ব্যবসা হালাল। এবং তা বর্ণনার জন্য বিশেষভাবে আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাজিল করেন।

ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, জাহেলী যুগে উকায, মিজান্না, জুল মাজায বাজারে এবং মিনায় ও আরাফায় ব্যবসা চলত। ইসলাম আসার পর ইহরাম বেধে ব্যবসা করার ব্যাপারে গোনাহের শঙ্কা হয়। আল্লাহ তায়ালা নাজিল করেন,

لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَبْتَغُوا فَضْلًا مِّن رَّبِّكُمْ
“তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করতে কোন পাপ নেই” (২:১৯৮) – অর্থাৎ হজ্জ্বের মওসুমে। [বুখারী: ২০৫২; আবু দাউদ: ১৭৩৪]

৩. হজ্জ্ব তাদের ওপরই ফরয যাদের এর সামর্থ্য আছে। কাজেই এতে আর্থিক সামর্থ্য অর্জন, পুঁজি সংগ্রহের (অবশ্যই বৈধ উপায়ে) বৈধতা ও উৎসাহ রয়েছে।

وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا [৩:৯৭]

(ইমাম গাজ্জালী রহ. এর ভিত্তিতে ইসলামে পুঁজি সংগ্রহের উৎসাহ দানের ব্যাপারটি গুরুত্ব দেন।)

৪. খ্রিস্টানদের পিলগ্রিমিজের একাধিক কেন্দ্র রয়েছে। মুসলিমদের একটিই। খ্রিস্টানদের মধ্যযুগীয় নানা মেলা ছিল। তন্মধ্যে উত্তর ফ্রান্সে আয়োজিত শ্যাম্পেন অন্যতম বৃহৎ। অথচ হজ্জ্বে যেখানে নূন্যতম সত্তর হাজার থেকে দুই মিলিয়ন লোক হত, সেখানে এ মেলার উপস্থিতির সংখ্যা ছিল নিতান্তই কম। তদুপরি এখানে উপস্থিত হত বেশির ভাগ ইটালিয়ান ও ফ্লেমিশ ব্যবসায়ী। অথচ হজ্জ্বে আগমন ঘটত পুরো বিশ্বের ব্যবসায়ীদের।

৫. হজ্জ্বের মৌসুমে মুসলিমদের অবস্থান থাকত হেরেমের এলাকায়, যার নিরাপত্তা বজায় রাখার দায়িত্ব প্রত্যেক যুগের শাসকের ওপর ন্যস্ত। কাজেই পূর্ণ নিরাপত্তার সাথেই সেখানে উন্মুক্ত বাণিজ্য সম্ভব ছিল।

শেষকথা, সেই সপ্তম শতাব্দীর শুরু থেকে হজ্জ্ব যে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের ব্যবস্থা করে আসছে, পশ্চিমারা হাজার বছর পর এ নেটওয়ার্কে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করেছে মাত্র।

===

তুর্কি বংশোদ্ভূত ড. মুরাত সিজাকা -র “ইসলামিক ফাইন্যান্স” ক্লাস লেকচার ও বই “ইসলামিক ক্যাপিটালিজম এ্যান্ড ফাইন্যান্স” অবলম্বনে, কিছুটা পরিবর্তনসহ। উল্লেখ্য তিনি আধুনিক ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের পথিকৃৎ, ১৯৬৩ সনে মিশরে প্রতিষ্ঠিত প্রথম ইসলামী ব্যাংক “মিটগামার সেভিংস ব্যাংক”-র প্রতিষ্ঠাতা ড. আহমেদ আল নাজ্জারের সাথে দুই বছর কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি প্রায়ই বলেন, ড. নাজ্জার যে স্বপ্ন নিয়ে যেভাবে ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে আগাতে চাচ্ছিলেন, বিশ্বব্যাপী মুসলিম ব্যাংকাররা একটু তাড়াহুড়াই করেছে। যার ফলাফল বর্তমান অবস্থা।

এছাড়া তিনি খেলাফতে উসমানিয়ার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে বেশ পড়াশোনা করেছেন। তুরস্কে নাকি প্রায় ৪০০ মিলিয়ন নথি রয়েছে উসমানী খিলাফতকালের। এছাড়া শত শত খন্ড কোর্টের ফয়সালা নথিবদ্ধ রয়েছে। সাম্প্রতিককালের অন্য কোনো মুসলিম শাসন ব্যবস্থার এত নথি সংগৃহিত নেই (যেমন মোঘল সাম্রাজ্যের)। কাজেই ইসলামকে কীভাবে প্র্যাকটিস করা হয়েছে এর সর্বশেষ ও সর্ববৃহৎ আর্কাইভ উসমানী খেলাফতকালের।