এক নজরে রোযার আহকাম ও মাসায়েল

রোযার হুকুম : রমজানের রোজা ইসলামের তৃতীয় ফরয।

قال الله تعالى { يا أيها الذين آمنوا كُتِبَ عليكم الصيام كما كُتِبَ على الذين من قبلكم لعلكم تتقون } . ﴿البقرة: ١٨٣﴾

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার। (সূরা বাক্বারা : ১৮৩)

যে এটা অস্বীকার করে, সে আর মুসলিম থাকে না। আর যে (শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া) রোজা না রাখে, সে বড় কঠিন গোনাহগার হবে।

রোযার রোকন / অপরিহার্য বিষয় :

১. নিয়্যত : নিয়্যত শব্দের অর্থ ইচ্ছা, মনে মনে সংকল্প করা, শব্দ উচ্চারণ না করেও তা হতে পারে।

রোযার জন্য নিয়্যত শর্ত। নিয়্যত বা ইচ্ছা না রেখে সারাদিন এমনিতে না খেয়ে থাকলেও তা রোযা বলে পরিগণিত হবে না।

নিয়্যত কখন করবে : রাতেই করে নেয়া উত্তম। তবে ভুলে গেলে মধ্যাহ্নের দেড়-দুই ঘন্টা পূর্ব পর্যন্ত যে কোনো সময় তা করে নিতে পারবে। শর্ত হলো, কিছু না খেয়ে থাকতে হবে।

২. পানাহার ও সহবাস থেকে বিরত থাকা।

أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَىٰ نِسَائِكُمْ ۚ هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ ۗ عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ كُنتُمْ تَخْتَانُونَ أَنفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنكُمْ ۖ فَالْآنَ بَاشِرُوهُنَّ وَابْتَغُوا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ ۚ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ۖ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ ۚ﴿البقرة: ١٨٧﴾

রোযার রাতে তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস করা তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ। আল্লাহ অবগত রয়েছেন যে,

তোমরা আত্নপ্রতারণা করছিলে, সুতরাং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করেছেন এবং তোমাদের অব্যাহতি দিয়েছেন। অতঃপর তোমরা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস কর এবং যা কিছু

তোমাদের জন্য আল্লাহ দান করেছেন, তা আহরন কর। আর পানাহার কর যতক্ষণ না কাল রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার দেখা যায়। অতঃপর রোযা পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত।

কার ওপর রমজানের রোযা ফরয :

মুসলিম, জ্ঞানসম্পন্ন, প্রাপ্ত বয়স্ক, স্থানীয় বসবাসকারী (মুসাফির নয়), সামর্থ্যবান (শরীয়ত অনুমোদিত কোনো সমস্যা বা বাধা নেই, যা পরে আলোচিত হবে)।

যেসব কারণে রোযা ভেঙে যায়, তবে শুধু কাযা করতে হয় :

1. কান বা নাকে ঔষধ দেয়া।
2. ইচ্ছাকৃত ভাবে মুখ ভরে বমি করা।
عن أبي هريرة أن النَّبيَّ صلى الله عليه وسلم قال : ” مَن ذرعه القيء فليس عليه قضاء ومن استقاء عمداً فليقضِ ” .
رواه الترمذي ( 720 ) وأبو داود ( 2032 ) وابن ماجه ( 1676 ) .

3. কুলি করার সময় কণ্ঠনালীর ভেতর পানি ঢুকে যাওয়া
4. বিড়ি, সিগারেট খাওয়া
5. ভুলে খাওয়ার পর রোযা ভেঙে গেছে ভেবে ইচ্ছাকৃত খেয়ে নেয়া

عن أبي هريرة رضي الله عنه عن النَّبيِّ صلى الله عليه وسلم قال : “إذا نسي فأكل وشرب فليتمَّ صومَه فإنما أطعمه الله وسقاه” .

رواه البخاري ( 1831 ) ومسلم ( 1155 ).
6. সময় আছে ভেবে সুবহে সাদিকের পর সাহরী খেয়ে নেয়া
7. সূর্য্য ডুবে গেছে ভেবে দিন বাকি থাকতেই ইফতার করে নেয়া

যেসব কারণে রোযা ভেঙে যায় এবং কাযা-কাফফারা দুটোই ওয়াজীব হয় :

1. জেনে বুঝে স্ত্রী সহবাস করা
2. জেনে বুঝে কিছু খাওয়া বা পান করা

{ أحلَّ لكم ليلة الصيام الرفث إلى نسائكم ……وكلوا واشربوا حتى يتبين لكم الخيط الأبيض من الخيط الأسود من الفجر } ﴿البقرة: ١٨٧﴾

রোযার রাতে তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস করা তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে।… আর পানাহার কর যতক্ষণ না কাল রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার দেখা যায়। অতঃপর রোযা পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত।

রোযার কাযা :

কোনো বৈধ কারণে রোযা না রাখলে পরে সুস্থ হলে বা সামর্থ হলে একটি রোযা রেখে নিবে। এটাকেই কাযা বলে। একসঙ্গেও সব রাখা যেতে পারে, ভিন্ন ভাবেও রাখা যেতে পারে।

কাফফারা কীভাবে দেয় :

1. একটি গোলাম আযাদ করে দেয়া।
2. একাধারে ষাটটি রোজা রাখা। মাঝে বিরতি আসলে আবার শুরু থেকে রাখা।
3. রোযার সামর্থ্য না থাকলে ষাট জন মিসকীনকে দুই বেলা পেট ভরে খাওয়াবে। খাবারের পরিমাণ সাদাকাতুল ফিতরের পরিমাণ। (আর সাদাকাতুল ফিতরের পরিমাণ ১.৭৫ কেজি গম)

বর্তমানে গোলাম/দাস/বাদী না থাকায় শেষ দুটির কোন একটি করতে হবে।

কাফফারা পরস্পর প্রবিষ্ট হয়। এক রমজানের একাধিক রোজা ভাঙলে বা কয়েক রমজানের রোজা ভাঙা থাকলে একটি কাফফারাই যথেষ্ট হবে।

তবে সামর্থ্য থাকাবস্থায় মিসকীন খাইয়ে দেয়া যথেষ্ট হবে না।

যেসব কারণে রোযা ভাঙ্গে না, তবে মাকরূহ হয়ে যায় :

1. বিনা কারণে কোনো কিছু চিবানো, লবন টেস্ট করা, টুথপেষ্ট ব্যবহার করা।
2. সারা দিন ফরয গোসল না করে না-পাক থাকা।
3. শিঙা লাগানো, কাউকে রক্ত দেয়া।
4. গীবত করা, কারো অনুপস্থিতিতে তার নিন্দা করা।
5. রোযা রেখে গালি দেয়া, ঝগড়া-মারামারি করা। মানুষ বা প্রাণী সব ক্ষেত্রেই একই বিধান।

যেসব কারণে রোযা ভাঙ্গে না, মাকরূহও হয় না :

1. মিসওয়াক করা। তবে মিওয়াকের আদ্রতা বা কোনো অংশ গলায় ঢুকে গেলে রোযা ভেঙে যাবে।

عن أبي هريرة رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : “لولا أن أشق على أمَّتي لأمرتُهم بالسواك مع كل صلاة ” . رواه البخاري ( 847 ) ومسلم ( 252 ) . وقال البخاري : ولم يخصَّ الصائم مِن غيره .

2. চোখে ঔষধ দেয়া ও সুরমা দেয়া
3. সুগন্ধির ঘ্রাণ নেয়া
4. গরমে বা পিপাসায় গোসল করা
5. ইঞ্জেকশন দেয়া
6. ভুলে কিছু খাওয়া বা পান করা

عن أبي هريرة رضي الله عنه عن النَّبيِّ صلى الله عليه وسلم قال : “إذا نسي فأكل وشرب فليتمَّ صومَه فإنما أطعمه الله وسقاه” . رواه البخاري ( 1831 ) ومسلم ( 1155 ).

আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল স. বলেছেন, কেউ যদি ভুলে কিছু খায় বা পান করে, তাহলে সে যেন রোযা পূর্ণ করে নেয়। কেননা আল্লাহই তাকে খাওয়ায় এবং পান করে। -বুখারী ও মুসলিম।

7. অনিচ্ছায় গলার ভেতর কোনো ধোঁয়া বা মশা-মাছি ঢুকে যাওয়া
8. কানে পানি অনিচ্ছাকৃত ভাবে ঢুকে যাওয়া
9. অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি করা
10. ঘুমানো অবস্থায় গোসল ফরয হওয়া।
11. দাঁত থেকে রক্ত পড়লো, কিন্তু কন্ঠনালীর ভেতর ঢুকলো না।
12. ঘুমের মাঝে বা সজাগ অবস্থায় গোসল ফরয হলো, কিন্তু ফজরের আগে গোসল করা গেল না, এমতাবস্থায় রোযার নিয়্যত করে নিল।
13. চুলে বা দাড়িতে তেল দেয়া

وعن عائشة وأم سلمة ” أنَّ رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يدركه الفجر وهو جنبٌ مِن أهله ثم يغتسل ويصوم ” . رواه البخاري ( 1825 ) ومسلم ( 1109 ) .

যেসব কারণে রোযা না রাখার অনুমতি আছে :

وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ ﴿البقرة: ١٨٥﴾

আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না

1. অসুস্থতার কারণে রোযা রাখার শক্তি নেই, বা রোগ বেড়ে যাওয়ার আশংকা থাকে তাহলে। (পরে কাযা করে নিবে)
2. গর্ভবর্তী মহিলা রোযা রাখলে যদি নিজের বা সন্তানের ব্যাপারে আশংকা করে।
3. যে মহিলা নিজ বা অন্যের বাচ্চাকে দুধ খাওয়ান, তিনি রোযা রাখলে যদি বাচ্চার কষ্ট হবে মনে করেন, তাহলে রোযা না রেখে পরে কাযা করতে পারবেন।
4. শরয়ী মুসাফির (কমপক্ষে ৪৮ মাইল ভ্রমণ করেছেন যিনি) তার জন্য রোযা না রাখার অনুমতি আছে। তবে কষ্ট না হলে রোযা রাখা উত্তম। অবশ্য নিজের বা সাথীদের কষ্ট হলে রোযা না রাখাই উত্তম।

عن عائشة رضي الله عنها زوج النَّبيِّ صلى الله عليه وسلم أن حمزة بن عمرو الأسلمي قال للنَّبيِّ صلى الله عليه وسلم أأصوم في السفر ؟ – وكان كثير الصيام – فقال : ” إن شئتَ فصم وإن شئتَ فأفطر “. رواه البخاري ( 1841 ) ومسلم ( 1121 ) .

5. যদি রোযা রেখে সফর শুরু করে, তাহলে সে রোযা পূর্ণ করা জরুরী। আর যদি খেয়ে দেয়া সফল থেকে বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়, তাহলে বাকি দিন খাওয়া-পানাহার বাদ দেয়া উত্তম। আর যদি না খেয়ে শুরু করে এরপর বাড়ি পৌঁছানোর পরও রোযার নিয়্যত করার সময় থাকে, তাহলে রোযার নিয়্যত করে নিবে।
6. কেউ কাউকে রোযা রাখলে হত্যার হুমকি দিল, বা কোনো ভাবে রোযা না রাখার উপর বাধ্য করলো, তাহলে রোযা না রেখে পরে কাযা করে নিতে পারেন।
7. ক্ষুধা বা পিপাসা যদি এত বেশি হয় যে, কোনো দ্বীনদার ডাক্তার প্রাণের আশংকা করেন, তাহলে রোযা ভাঙা যাবে, তবে পরে কাযা করে নিতে হবে।
8. মহিলাদের ঋতুকালীন সময়ে বা সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরবর্তী অসুস্থকালীন সময়ে রোযা রোযা রাখা যাবে না। তবে পরে কাযা করে নিতে হবে।

এসব কারণ ছাড়া এমনিতে আমাদের সমাজে অনেকে এ মাসে অসুস্থ বনে যান। এটা অনেক আফসোসের বিষয়। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সব রকম চালাকি বুঝতে পারেন।

যাদের জন্য রোযা ভাঙার অনুমতি আছে, তাদের উচিৎ রমজানের সম্মান ধরে রাখা। প্রকাশ্যে কোনো কিছু না খাওয়া।

রোযা রাখার পর কেউ অসুস্থ হয়ে গেলে এবং রোযা রাখলে তা বাড়ার নিশ্চিত সম্ভাবনা থাকলে রোযা ভাঙতে পারবে। শুধু কাযা করলেই চলবে, কাফফারার প্রয়োজন হবে না।

ফিদয়ার পরিমাণ : ২.২৫ কেজি গম – যে ব্যক্তির সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, গুরুতর অসুস্থ, তার প্রতিটি রোযার পরিবর্তে মিসকীনকে একটি ফিদয়া দেয়া যেতে পারে।

——-

রোযার সাথে সম্পর্কিত কোনো প্রশ্ন থাকলে মন্তব্যের ঘরে করতে পারেন। যথাসম্ভব দ্রুত এবং অথেনটিক উত্তর দেয়ার চেষ্টা করা হবে ইনশা’আল্লাহ।