সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রতিরোধে ইসলাম

এক.

“সংখ্যালঘু” শব্দটি বৈষম্যপূর্ণ। ইসলামে এমন কোনো শব্দ নেই। আল্লাহ তায়ালা আল-কুরআনে মানুষকে মূলত দু’ভাবে সম্বোধন করেছেন। “হে মানবজাতি” ও “হে ঈমানদারগণ”। মুমিনদের উদ্দেশে বিশেষ কিছু বলতে হলে বলেছেন “হে ঈমানদাররা”, অন্যথায় “হে মানবজাতি” বলে সমগ্র মানবজাতিকে সম্মানের সাথে সম্বোধন করেছেন।

ইসলামের শুরুটা অল্পসংখ্যক মানুষকে দিয়েই। এজন্য প্রথম দিকে মুসলিমদের অনেক নির্যাতিত হতে হয়েছে। মুসলিমরা তাতে কখনো দমে যাননি। ঈমানের পথে দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করেছেন সকল বাধা।

তাকওয়া ছাড়া মানুষের সম্মান নির্ধারণের আর কোনো উপায় নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়ার অধিকারী”। (সূরা হুজুরাত: ১৩) রাসূল স. বলেছেন, “জেনে রাখো! কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের সম্মান নেই, আবার কোনো শুভ্রবর্ণের ব্যক্তির ওপর কোনো কৃষ্ণবর্ণের ব্যক্তির সম্মান নেই, তাকওয়ার মাধ্যম ছাড়া”। (শুয়াবুল ঈমান)

অর্থাৎ, একমাত্র তাকওয়াই ব্যক্তি সম্মানের মাপকাঠি। আর তাকওয়া যেহেতু অন্তরের বিষয়, বাহ্যিকভাবে দৃশ্য নয়, তাই বাস্তবে মানুষ হিসেবে সম্মানের দিক থেকে ভেদাভেদের তেমন কোনো সুযোগ নেই। আর সে জন্যই সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘু হওয়া সম্মানিত বা অসম্মানিত হওয়ার কোনো কারণ মোটেও নয়।

 

দুই.

ইসলাম রহমতের ধর্ম, দয়ার ধর্ম। আল্লাহ তায়ালা রাসূল স. কে পাঠিয়েছেন সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে। (সূরা আম্বিয়া: ১০৭) তাঁর প্রতিটি কথায়, কাজে ও আচরণে দয়া-মায়ার ছোঁয়া লেগে থাকত। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই তাঁর দয়া ও ভালবাসায় ধন্য হত।

ওহুদের যুদ্ধে রাসূলের স. দাঁত মোবারক শহীদ হওয়ার পর কয়েকজন সাহাবী তাদের বিরুদ্ধে বদ দোয়া করতে বললে তিনি স. দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! আপনি আমার কাওমকে হিদায়াত দিন। তারা তো বুঝে না”। (শুয়াবুল ঈমান)

মক্কা বিজয়ের পর সবাই যখন থরথর করে কাঁপছে, ভাবছে আজই বুঝি জীবনের শেষ দিন, আজ মুহাম্মদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নেই, তখন তিনি দয়ার চূড়ান্ত পরিচয় দিয়ে বললেন, “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। যেতে পারো, আজ তোমরা মুক্ত”।

এছাড়া দয়া-মায়া-ভালবাসার ব্যাপারে তাঁর অসংখ্য বক্তব্য ও হাদীস তো আছেই। তিনি বলেন স., “পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়া করবেন”। (তিরমিযী) এমনকী পশু-পাখির সাথে দয়াশীল আচরণ করার ব্যাপারেও তাঁর হাদীস রয়েছে, যা কারো অজানা নয়।

 

তিন.

ইসলাম শুরু হয়েছে অমুসলিমদের ভেতর থেকেই। অমুসলিমরা ধীরে ধীরে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিমদের দল ভারী করেছেন। কাজেই ইসলামের প্রাথমিক যুগের পুরোটাই অমুসলিমদের সাথে মুসলিমদের সুন্দর আখলাক ও আচার-ব্যবহারের দৃষ্টান্ত রেখে গেছে।

তদুপরি মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের পর রাসূল স. মদীনা ও তার আশ-পাশের ইহুদীদের নিয়ে একটি ঐক্য গড়ে তুলেন। ইতিহাসে যা মদীনা সনদ নামে পরিচিত। সেই সনদও অমুসলিমদের সাথে মুসলিমদের বসবাসের রূপরেখা তুলে ধরে।

রাসূলের স. পর তাঁর খলীফাগণও অমুসলিমদের সাথে মুসলিমের আচার-ব্যবহারের ব্যাপারে সঠিক দিক-নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছেন।

ইসলাম একজন অমুসলিমকে তার জান-মাল-ইজ্জত-বাসস্থান ও তার উপাসনালয়ের সুরক্ষা প্রদান করে। তাকে ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রদান করে।

রাসূল স. বলেন, “যে ব্যক্তি মুসলিমদের সাথে অঙ্গিকারাবদ্ধ কোনো অমুসলিমকে হত্যা করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না”। (বুখারী) অপর এক সূত্রে বর্ণিত, অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।

তিনি স. আরো বলেন, “সাবধান!  মুসলিমদের সাথে অঙ্গিকারাবদ্ধ অমুসলিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাত করা হালাল হবে না”। (মুসনাদ আহমদ)

খলীফা ওমর রা: তাঁর পরবর্তী খলীফাকে অসীয়ত করে যান, “আমি তাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের যিম্মায় অসীয়ত করছি যে, তাদের (অমুসলিম) সাথে কৃত অঙ্গিকার যেন পূরণ করা হয়, তাদের হক বিনষ্টকারীদের সাথে যেন লড়াই করা হয় আর তাদেরকে যেন সাধ্যের বাইরে কাজ না দেয়া হয়”। (বুখারী)

আল্লাহ তায়ালা আল-কুরআনের সূরা নূরে নিজের ঘর ব্যতীত অন্যের ঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রে মুমিনদেরকে সতর্ক করেন। কারো ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতি প্রার্থনা ও সালাম দেয়ার নির্দেশ দেন। কেউ ঘরে না থাকলে তার ঘরে প্রবেশে নিষেধ করেন। (সূরা নূর: ২৭-২৮) এছাড়া রাসূল স. বলেন, যে ব্যক্তি কারো বাড়ীর দিকে অনুমতি ছাড়া উঁকি দেয় বা তাকায়, তার চোখ উপড়ে ফেলা তাদের জন্য হালাল হয়ে যায়। (মুসলিম)

উল্লিখিত আয়াত ও হাদীসে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের বাড়ীর ক্ষেত্রেই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কাজেই কোনো অমুসলিমের বাড়ীতেও তার অনুমতি ছাড়া প্রবেশ বা তাকানো অনুমিত নয়।

অনুরূপভাবে তাদের ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোকেও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দেয়া হবে। এবং অন্যান্য ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারও তারা যথাযথ পাবে।

 

চার.

যে কোনো অধিকারের সাথে কিছু দায়িত্ব সংযুক্ত থাকে। অধিকার ও দায়িত্ব একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। দায়িত্ব পালন না করলে কিংবা পালনে ত্রুটি করলে অধিকার ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো অফিসে কেউ চাকুরী করে। চাকুরী করার সুবাদে সে মাস শেষে পারিশ্রমিক পায়, অফিসে অন্যান্য কর্মচারীর সুযোগ-সুবিধা পায়। কিন্তু সে যদি চাকুরীতে অর্পিত দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে তার সুযোগ-সুবিধা পাওয়া তো দূরের ব্যাপার, চাকুরী টিকিয়ে রাখাটাই দায় হয়ে যাবে।

একইভাবে ইসলাম যে কোনো অধিকার বা সুযোগ-সুবিধার সাথে কিছু দায়িত্ব জুড়ে দেয়। একজন মুমিনের ব্যাপারে ওয়াদা হলো, সে জান্নাতে যাবে, জান্নাতের সুযোগ-সুবিধা পাবে। কিন্তু তা পাওয়ার জন্য দুনিয়াতে তাকে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার দায়িত্ব পালন করতে হবে।

ঠিক তেমনি একজন অমুসলিম তার সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ও সুরক্ষা প্রাপ্তির পাশাপাশি তার কিছু দায়িত্ব ইসলাম ঠিক করে দিয়েছে। অবশ্য সেই দায়িত্ব কোনো করণীয় দায়িত্ব নয়। বরং বর্জনীয়। অর্থাৎ, এই দায়িত্ব পালনে কোনো শ্রম ব্যয় হবে না, বরং কেবল একটু সংযমী হতে হবে।

দায়িত্বটি হলো, ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য ক্ষতিকারক বা অবমাননাকর কোনো কিছু করা যাবে না। এবং ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যায় এমন কোনো কিছু প্রকাশ্যে করা যাবে না।

ধর্মীয় আঙ্গিক থেকে এক ধর্মের অনেক কিছুই অন্য ধর্মে অন্যায় বা সমর্থিত নয়। নিজেদের অঙ্গনে তা করা কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু তা প্রকাশ্যে করা মুসলিমদের জন্য ক্ষতিকারক।

তাই ইসলামের অবমাননা, ইসলামের কোনো বিধানের ঠাট্টা বা অবমাননা, ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো অন্যায় প্রকাশ্যে করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।

প্রসঙ্গত, এসব বিষয় মুসলিমদের জন্যও আবশ্যক নির্দেশ। তাই এগুলো কেবল অমুসলিমদের জন্য, এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই।

আসলে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অবমাননা ইসলাম কখনো পছন্দ করে না। আর প্রকাশ্যে ইসলামের বিধান লঙ্ঘন ইসলাম অবমাননার শামিল। যেমনভাবে সংবিধান লঙ্ঘন করাকে সংবিধান অবমাননার ন্যায় গুরুতর অপরাধ।

 

পাঁচ.

সম্প্রতি বিভিন্ন জায়গায় অমুসলিমদের বাড়ী-ঘর ও উপাসনালয়ে নির্যাতনের খবর প্রকাশ পাচ্ছে। এক্ষেত্রে ইসলামের অবস্থান সুস্পষ্ট। ইসলাম কখনো তা সমর্থন করেনি, কখনো করবেও না।

আর কোনো ব্যক্তি কোনো অপরাধ করলে তার ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে বড় পরিচয় হলো, সে অপরাধী। রাসূল স. বলেন, “কোনো ব্যভিচারী ব্যভিচার করার সময় মুমিন থাকে না, কোনো চোর চুরি করার সময় মুমিন থাকে না”। (বুখারী)

এই হাদীস থেকে বুঝা যায়, অপরাধীর কোনো ধর্মীয় পরিচয় নেই। কোনো মুসলিম যদি এরকম কোনো অপরাধ করে, তাহলে তার ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করা বরং ধর্মকে খাটো করা। ইসলাম তা কখনো সমর্থন করে না।

কাজেই মিডিয়া ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করুন, তার শাস্তি নিশ্চিত করণে পদক্ষেপ নিন। অপরাধীকে ধর্মের পোষাকে জড়িয়ে পরোক্ষভাবে ধর্মের অবমাননা করা থেকে বিরত থাকুন। ধর্ম কখনো অপরাধকে সমর্থন করে না।


প্রবন্ধটি রাহমানী পয়গাম, এপ্রিল ২০১৩ সংখ্যার জন্য লিখিত।