প্রশ্ন : মূসা আ. কি সত্যিই মালাকুল মাওতকে (জান কবযের ফেরেশতা) মেরেছিলেন?

প্রশ্ন : Assalamu Alaikum. Yousuf bhai. Ami apnar bloger ekjon niyomito pathok. Ekta Q. Dilam. Shomoy kore ans biben. http://www.somewhereinblog.net/blog/rafezi66/29267992

আমরা জানি,হাদিছে কুদছী হচ্ছে আল্লাহ রাসুল(সাঃ)কে ইলহাম কিংবা স্বপ্ন দ্বারা জ্ঞাত করাইয়াছেন অথবা হযরত জিব্রাইল(আঃ)এর মাধ্যমে জ্ঞাত করাইয়াছেন,আর রাসুল(সাঃ) উহা নিজ ভাষায় বননা করিয়াছেন,তাহাকেই হাদীছে কুদছী বলে।কিন্তু বাংলাদেশ ইসলামি ফাউন্ডেশন ‘হাদিছে কুদছী’ (সংকলকঃআল্লামা মুঃ মাদানী) নামক একখানা বই ছেপেছে (অনুবাদঃমোমতাজ উদ্দীন আহমদ, জুন,১৯৯১) সেটির একটি হাদিছ নিম্নরুপঃ
হাদীছ নংঃ২৮৩,পৃঃ২২৬-

“মুসা(আঃ)এর নিকট মালাকুল মউত আসিলেন এবং বলিলেন, ‘তোমার প্রভুর ডাকে সাড়া দাও’।

তখন মুসা(আঃ) মালাকুল মউতের চোখের উপর এমন জোরে চপেটাঘাত করিলেন যে,উহা ফাটিয়া গেল।তৎপর ফেরেশ্তা আল্লাহর নিকট ফিরিয়া গেলেন এবং বলিলেন, ‘আপনি আমাকে আপনার এরুপ বান্দার নিকট পাঠাইয়াছিলেন,যে মৃত্যু চায়না।আর সে আমার চক্ষু উতপাটন করিয়া ফেলিয়াছে ’।

তখন আল্লাহ তাহার চক্ষু ফিরাইয়া দিয়া বলিলেন, ‘ তুমি পুনরায় আমার সেই বান্দার নিকট যাও এবং বল,তুমি কি জীবিত থাকিতে চাও’?যদি তুমি জীবিত থাকিতে চাও তবে একটা বলদের পিঠে তোমার হাত রাখ।তোমার হাতে যে পরিমান লোম ঢাকা পড়ে,তুমি উহার সমসংখ্যক বছর বাঁচিবে।মুসা বলিলেন, ‘তারপর কি হইবে’?তিনি (মালাকুল মউত) বলিলেন,তারপর তুমি মরিবে।মুসা(আঃ) বলিলেন, ‘তবে আমি এখনি মৃত্যুবরন করিতে প্রস্তুত ’।

অতঃপর তিনি বলিলেন, ‘হে আমার প্রভু !বায়তুল মুকাদ্দাস হইতে আমাকে একটি পাথর নিক্ষেপের পরিমান নিকটবরতী করিয়া দাও’নবী(সাঃ) বলিলেন, ‘আল্লাহর শপথ!যদি আমি বায়তুল মুকাদ্দাসের নিকটবরতী হইতাম,তবে তোমাদিগকে নিশ্চয়ই মুসা(আঃ)এর কবর দেখাইয়া দিতাম যাহা রাস্তার এক পাশে একটি লাল বালুর টিলায় অবস্থিত”। (আহমদ ও শায়খায়ান ইহা আবু হোরায়রার সুত্রে সংগ্রহ করিয়াছেন,অনুরুপ হাদিছ হাকেমও সংগ্রহ করিয়াছেন।

সুপ্রিয় পাঠক,আমরা জানি,হযরত মুসা(আ.) হচ্ছেন আল্লাহর একজন সম্মানিত নবী(আঃ) এবং মালাকুল মউত আজ্রাইল আমিন(আ.)হচ্ছেন আল্লাহর একজন সম্মানিত ফেরেস্তা যিনি আল্লাহর নিদেশে জীবের প্রান সংহার করেন।আর ফেরেস্তারা হচ্ছেন নুরের তৈ্রী,তাদের কোন চোখ বা হাত পা নেই।তাহলে এটা কি করে সম্ভব যে সম্মানিত মুসা(আঃ) থাপ্পড় মেরে আজ্রাইল(আঃ)এর চোখ ফাটিয়ে দেবেন?আর যখন আল্লাহ প্রান সংহারের জন্য আজ্রাইল আমিন(আঃ)কে পাঠালেন আর মুসা(আঃ) তা প্রত্যখ্যান করলেন,এটা কি করে সম্ভব?এটা কি সুস্পস্ট আল্লাহর নিদেশের লংঘন নয়?আর মুসা(আঃ)এর মত সম্মানিত নবীর পক্ষে কি এটা আদৌ সম্ভব?কেউ কি আছেন,পবিত্র কুরানের আয়াতের সাথে মিলিয়ে এই হাদীছটিকে সত্যায়ন করতে?চিন্তাবিদ,গবেষক ও পাঠক,আপনাদের গঠনমুলক মতামতের অপেক্ষায় রইলাম।

উত্তর : ওয়ালাইকুম আসসালাম। প্রথমেই আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি যে, অন্য অনেকের মতো আন্দাজের ওপর হাদীসটিকে জাল না বলে আপনি এ সম্পর্কে অথেনটিক মতামত জানতে চেয়েছেন। আল্লাহ আপনার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল করুন। আমীন।

আমাদের উত্তরের সারমর্ম দুটো।

১. হাদীসটি জাল নয়। বরং, অত্যন্ত শক্তিশালী হাদীস।

২. এটা মূসা আ. এর ব্যক্তিত্বের পরিপন্থী নয়। বরং, হয়ত এটা আল্লাহর নির্দেশে, তাঁর অনুমতিতেই করেছেন। নতুবা, তিনি না জেনে করেছেন। আর উভয় ক্ষেত্রেই ব্যক্তিত্বে কোনো দোষ আসে না।

আসুন এবার বিস্তারিত আলোচনায় যাই।

এক.

এই হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম শরীফে মোট ৪ টি সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।

বুখারী শরীফে (প্রকাশক : দারু ইবনে কাসীর, বাইরুত; প্রকাশকাল : ১৯৮৭, তৃতীয় সংস্করণ) :

১. ১৩৩৯
২. ৩৪০৭

মুসলিম শরীফে (প্রকাশক : দারু ইহয়াই তুরাসিল আরাবী; ১ম প্রকাশ)

১.২৩৭৩
২.২৩৭৪

এই হাদীসটি প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত হাদীসগ্রন্থ মিলিয়ে প্রায় ৩৬টি কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। এর মোট সূত্র প্রায় ৬৪টি। তন্মধ্যে ২৭টি সহীহ, ১৮টি হাসান এবং ১৯টি দয়ীফ। কোন সূত্র মাওদূ বা জাল নেই। সবমিলিয়ে এর সূত্র সহীহ। ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম নাসায়ী ও ইমাম আহমাদ সহ অন্য অনেকেই হাদীসটিকে শক্তিশালী সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

কাজেই এই হাদীসটিকে জাল হাদীস বলার কোনো অবকাশ নেই।

দুই.

এবার আসা যাক হাদীসটির ব্যাখ্যায়।

মুসলিম শরীফের প্রখ্যাত ব্যাখ্যাতা ইমাম নববী রহ. এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন,

“মারিযী বলেছেন, অনেক নাস্তিক হাদীসটিকে অস্বীকার করে এবং এর বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারে না। তারা বলে, এ কীভাবে সম্ভব যে মূসা আ. মালাকুল মাওতের (আজরাইল বলে আমরা যাঁকে চিনি) চোখ ফাটিয়ে ফেলেছেন?!

মারিযী বলেন, আলেমগণ এর কয়েকটি উত্তর দিয়েছেন।

১. এটা অসম্ভব নয় যে মূসাকে আ. এই প্রহারের ব্যাপারে পূর্বে আল্লাহ তা’আলা অনুমতি দিয়েছেন। এবং এটা মালাকুল মাওতকে পরীক্ষা করার জন্য করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর সৃষ্টির ব্যাপারে যা ইচ্ছে তা-ই করেন। এবং যখন ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা পরীক্ষা করেন। কাজেই এরূপ হওয়াটা খুবই সম্ভব।

২. এটা রূপক অর্থে বলা হয়েছে। আসল অর্থ হলো, মূসা আ. মালাকুল মাওতের সাথে তর্কে ও প্রমাণে জিতেছেন। আরবীতে এমন ব্যবহার আছে যে, কারো সাথে দলীল প্রমাণে জেতাকে فَقَأَ فُلَان عَيْن فُلَان বলে ব্যক্ত করা হয়। যার অর্থ, অমুক অমুকের চোখ ফাটিয়ে দিয়েছে।
অবশ্য এই উত্তরটি দুর্বল। কেননা, হাদীসে আছে যে পরে আল্লাহ তা’আল্লাহ মালাকুল মাওতের চোখ ফিরিয়ে দিয়েছেন। কাজেই রূপক অর্থ নেয়া যায় না।

৩. মূসা আ. প্রথমবার বুঝতে পারেন নি যে, ইনি মালাকুল মাওত। এবং ভেবেছেন কোনো লোক তাঁকে মারতে এসেছে। তাই তাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। আর ঘটনাচক্রে মালাকুল মাওতের চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন নয় যে তিনি ইচ্ছা করে চোখে আঘাত করেছেন। এটা হাদীসের শব্দ ‘صَكَّهُ’ থেকেই প্রমাণিত হয়।
এই উত্তরটিই ইমাম আবু বাকর বিন খুযায়মা এবং অন্যান্য মুতাকাদ্দিমীন আলেমগণ দিয়েছেন। মারিযী, কাযী ইয়ায প্রমুখও এই উত্তরটিকেই গ্রহণ করেছেন। তারা বলেছেন, হাদীসে এমন কোনো কথা স্পষ্টভাবে বলা হয় নি যে, তিনি ইচ্ছাকৃত ভাবে চোখ ফাটিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, হাদীসে দ্বিতীয়বার মালাকুল মাওতের আগমনের বর্ণনায় এটা স্পষ্ট যে মূসা আ. তাঁকে চিনতে পেরেছেন। এর উত্তর হলো, দ্বিতীয়বার মালাকুল
মাওত নিশ্চয় এমন ভাবে এসেছেন যে তাকে চেনা যায়। এজন্যই মূসা আ. আত্মসমর্পণ করেন। আল্লাহ ভালো জানেন।”

মোটকথা, হাদীসটি সহীহ এবং মূসা আ. ও নিরপরাধ। কাজেই হাদীসটিকে অস্বীকার করা বা জাল বলার কোনো কারণ নেই। আল্লাহ আমাদের সত্য বোঝার তাওফীক দিন। আমীন।