তাবলীগ: দ্বীনের সুসংহত প্রচারকদল

মাঝেমধ্যে কিছু ভালো মানুষের দেখা পাই। পরিবারে, কিংবা এলাকায়। তাঁরা আমানতদার, বিশ্বস্ত, সৎ ও সাদা মনের মানুষ। তাদের কোনো মিডিয়া কভারেজ নেই, তারাও মিডিয়াবিমুখ। নিজে না খেয়ে তারা অন্যকে খেতে দেন। নিজে না পরে অন্যকে পরানোর চেষ্টা করেন।

বিপদে অন্যের পাশে এসে দাঁড়ান। ভালো পরামর্শ দেন, ভালো বন্ধু হন। তারা নামাযের ব্যাপারে খুব সতর্ক, আল্লাহর আমানত রক্ষায় তারা আপোষহীন। মসজিদের কাতারে তাদেরকেই বেশি দেখা যায়। শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখে তারা কালেমার দাওয়াত দেন। দ্বীন ইসলামের কথা বলেন। ব্যথাতুর হৃদয়ে ঘোরেন এ ঘর থেকে ও ঘরে, এ গলি থেকে ও গলিতে।

পকেটের টাকা খরচ করে দ্বীনের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেন। লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ –র দীক্ষায় দীক্ষিত করেন নিজেদেরকে, পয়গাম পৌঁছে দেন পরিবার, এলাকাসহ পুরো বিশ্বে।

সমাজের এ মানুষগুলোকে আমরা তাবলীগের সাথী বলে জানি। তাবলীগ মানে প্রচার, দ্বীনের প্রচার। প্রচারেই প্রসার, কথাটি প্রসিদ্ধ। যে কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে একটি প্রচারক দল থাকে, যাদেরকে মার্কেটিং টিম বলা হয়। তারা বিভিন্ন উপায়ে প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবার বিষয় অন্যের কাছে প্রচার করে থাকেন। মানুষ তাদের মাধ্যমেই পণ্যের বিষয়টি জানেন, এর গুণাগুণ সম্পর্কে অবগত হন।

আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে মানুষের চলার জন্য এক অসাধারণ ম্যানুয়াল পাঠিয়েছেন। মানুষ কীভাবে বাঁচবে, কী খাবে, কীভাবে উপার্জন করবে, কী উপার্জন করবে, কীভাবে ব্যয় করবে, কী ব্যয় করবে, বিবাহ কীভাবে করবে, কাকে করবে, সমাজ কীভাবে পরিচালনা করবে, কে করবে –ইত্যাদি যাবতীয় বিষয় এতে বলা আছে। মানুষের জীবনের এমন কোনো দিক নেই, যে ব্যাপারে ম্যানুয়ালটিতে মৌলিক নির্দেশনা নেই।

কল্পনা করুন, পৃথিবীর কোনো এক জায়গায় বিজ্ঞানীরা মাটি খুঁড়ে এক প্রাচীন বইয়ের সন্ধান পেল। বিশেষ ভাষায় লেখা বইটি পড়তে বিশেষজ্ঞ টিম আনা হলো। দেখা গেল, হাজার বছর আগে লেখা হওয়া সত্ত্বেও বইটিতে এমন অনেক তত্ত্ব ও বিষয়ের কথা বলা হয়েছে, যা বিজ্ঞানীরা জেনেছেন এই গত কয়েক শতাব্দীকালে। আবার এমন অনেক ভবিষ্যতবাণী রয়েছে, যা বর্তমানের সাথে মিলে যাচ্ছে। এতে শান্তির পথ বলে দেয়া আছে।

পৃথিবীর সমস্ত মিডিয়া হুমড়ি খেয়ে পড়বে সংবাদটি কভারেজ দেয়ার জন্য। বড় বড় রঙিন হরফে শিরোনাম হবে, ‘হাজার বছরের পুরনো রহস্যজনক নথি উদ্ধার’ বা এমন কিছু। এর বিষয়বস্তু ধারাবাহিকভাবে অনূদিত হবে, পৃথিবীর তাবৎ ভাষায়।

আফসোস আমাদের, মাটির নিচের সেই কল্পিত বইয়ের চেয়ে হাজার গুণ বেশি বিশেষায়িত, বরং অতুলনীয়, এক মহাগ্রন্থ, বা মহাম্যানুয়াল, আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় হাবীব রাসূল স. এঁর মারফতে আমাদেরকে দিয়েছেন। আমরা শেলফের ভেতর, আলমারির ওপরে বা মসজিদের তাকে তা সাজিয়ে রাখছি, বছরের পর বছর। এতে আমাদের জীবনের চূড়ান্ত সফলতা, মহাসত্য ইত্যাদি কত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তা কখনো ভেবেও দেখছি না।

এই বইটিতে যে এসব মূল্যবান বিষয় রয়েছে, তা অন্যকে আমাদের জানাতে হবে। যে কোনো কাজের চূড়ান্ত সফলতা একটি ভালো ফলাফল প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে আসে। শেষ বিচার দিবসে সেই ব্যক্তিই সফলকাম হবেন, যিনি এই কিতাবানুসারে, রাসূলের স. দেখানো পথানুসারে, তাঁর জীবনকে সাজিয়েছেন, বিশ্বাসকে গড়েছেন। অন্যকে জানানোর এ দায়িত্বটি আমাদের সবারই। আল-কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে মুমিনগণ,তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর,যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর”। [আল-কুরআন ৬৬:৬]

অনুরূপভাবে প্রিয় রাসূল স. বলেন, “সাবধান! জেনে রাখো, তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে (কিয়ামতের দিন) প্রশ্ন করা হবে”। [সহীহ বুখারী: ৮৯৩]  তিনি আরো বলেন, “তোমাদের কেউ যদি কোনো অন্যায় দেখে, সে যেন হাত দিয়ে তা প্রতিহত করে; সম্ভব না হলে মুখের ভাষায় প্রতিবাদ জানায়; নতুবা অন্তত অন্তরে ঘৃণা করে (বা প্রতিহতের পরিকল্পনা করে), আর এটি ঈমানের সবচেয়ে নিচের স্তর”। [সহীহ মুসলিম: ৪৯]

কাজেই এই ম্যানুয়ালের কথা, ঈমানের কথা, অন্যকে জানানোর দায়িত্ব সবারই। সবাই নিজ নিজ পরিমণ্ডলে প্রচারক হিসেবে কাজ করবেন। এরপরও একটি সুসংহত প্রচারকদলের প্রয়োজন, যারা নিজেদের পুরো সময়টাকে এই প্রচারকাজেই উৎসর্গ করবেন, ঠিক কোনো প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং টিমের মতো। এমন কোনো দল না থাকলে দ্বীনের সৌন্দর্য হয়ত অনেকেরই অজানা থেকে যাবে। আল-কুরআনে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত দরদ নিয়ে বলেন, “তাই তাদের (মুমিনদের) প্রতিটি দলের কিছু মানুষ কেন বের হয় না,যেন তারা দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে, এবং ফিরে এসে স্বজাতিকে সতর্ক করে, যেন তারা (আযাব থেকে) বাঁচতে পারে।” [আল-কুরআন ৯:১২২]

বর্তমানকালে মুসলিমদের অনেকেই অনেকভাবে দ্বীনের কথা অন্যের কাছে পৌঁছে দিলেও, এ ব্যাপারে কারো সংশয় নেই যে, সুসংহতভাবে ও দলীয়ভাবে ইসলাম প্রচারে তাবলীগ জামাতের অবদান সবচেয়ে বেশি। রাসূলুল্লাহ স. এঁর হাতে গড়া এ জামাতটিকে গত শতাব্দীর শুরুর দিকে যুগোপযোগী সিলেবাসে বিন্যস্ত করেন মাওলানা ইলিয়াস রহ.। ক্রমান্বয়ে এ জামাতটি বিশ্বের দুই শতাধিক দেশে প্রবেশ করে। অনেক অমুসলিম তাদের হাতে ইসলামের ছায়াতলে আসার সৌভাগ্য অর্জন করেন।

মাওলানা ইলিয়াস রহ. এ জামাতটির সিলেবাস একই সাথে একটি ভ্রাম্যমান মাদ্রাসা ও একটি প্রচারকদলের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তৈরি করেন। ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলীকে সাধারণ মানুষ যেন সহজে মনে রাখতে পারেন, সেভাবে তিনি ছয়টি মূলনীতি প্রণয়ন করেন। মূলনীতি ছয়টি হলো, কালিমা বা ঈমান, সালাত বা নামায, ইলম ও যিকির তথা জ্ঞানার্জন ও আল্লাহর স্মরণ, ইকরামুল মুসলিমীন বা অপর মুসলিমকে সম্মান করা, ইখলাসে নিয়ত বা নিয়ত পরিশুদ্ধ করা এবং দাওয়াত ও তাবলীগ বা ইসলাম প্রচার।

এটা একেবারেই স্পষ্ট যে, ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলীকে সাধারণ মানুষের উপযোগী করেই এই ছয়টি মূলনীতিতে তুলে ধরা হয়। কালিমা বা ঈমান ইসলামের একেবারে মৌলিক বিষয়। ঈমানের পর মুমিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নামায। এরপর আল-কুরআন ও হাদীসের জ্ঞানার্জন মুমিনের অপরিহার্য বিষয়। জ্ঞানার্জনের প্রেক্ষিতেই আসবে আল্লাহর স্মরণ, যা সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য।

ইসলামের বাহ্যিক সৌন্দর্য হলো, মানুষের সাথে ওঠাবসা ও চলাফেরার শিষ্টাচার। হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ, অহংকার ইত্যাদি দমন, এবং ক্ষমা, নম্রতা, বিনয় ও অন্যকে প্রাধান্য দেয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা – এগুলোই শিষ্টাচারের মূল কথা। ইকরামুল মুসলিমীন শিরোনামে এসবই আলোচ্য। এরপর রয়েছে নিয়ত পরিশুদ্ধিকরণ। মূলত একজন মুমিনের সকল আমলই যাচাই হবে তার নিয়ত ও একনিষ্ঠতার মাপকাঠিতে। সবশেষে রয়েছে দাওয়াহ ও তাবলীগ। প্রথম পাঁচটি মূলনীতি নিজেকে পরিশুদ্ধ করার জন্য। এই পাঁচটি শেষে অন্যকে পরিশুদ্ধ করার দায়িত্ব আসবে। অর্থাৎ, নিজে যা জানল, তা অন্যকে জানাতে হবে। দ্বীনের আহ্বান পৌঁছে দিতে হবে।

সামান্যতম দ্বীনী জ্ঞান যার আছে, তিনি বুঝবেন, তাবলীগ জামাতের এ সিলেবাসে যা কিছু আছে, তার সবই ইসলামের সিলেবাস। কেবল সাধারণ মানুষের উপযোগী করে সিলেবাসটি প্রণয়ন করা, এই যা। শৈশবে সবার হয়ত কোনো দ্বীনী মাদ্রাসায় যাওয়া সম্ভব হয় না। বড় হয়ে নানা ব্যস্ততায় জড়িয়ে পড়তে হয়। এই মানুষগুলো কেন দ্বীনী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে? মাস্টার্স পর্যায়ের না হোক, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা তো অন্তত প্রত্যেক মুসলিমের থাকতে হবে। হাদীসে আছে, “প্রয়োজনীয় (দ্বীনী) জ্ঞানার্জন সব মুসলিমের ওপর ফরয”। [সুনান ইবনে মাজাহ: ২২৯]

সমাজে এমন মুসলিম অসংখ্য, যারা কালেমাটা পর্যন্ত জানেন না। ঈমানের সাথে পরিচিত নন। কবরের আযাব বিশ্বাস করেন না। পুনরুত্থান অবিশ্বাস করেন। রাসূলের স. পরিচয় জানা নেই। নামায তো পড়েনই না। কিংবা এখনো মুসলিম নন। তাদের কি দ্বীন সম্পর্কে জানার অধিকার নেই? জীবনের চূড়ান্ত সফলতার প্রার্থিতার সুযোগ কি তাদের থাকবে না?

আশ্চর্য হতে হয়, যখন দেখা যায়, আমাদেরই কিছু ভাই তাবলীগের ইজতিমাকে ব্যঙ্গ করেন ‘ইস্তিঞ্জা’ বলেন। সমালোচনা করেন, তারা তো জিহাদে অংশ নেন না, রাজনীতি করেন না, তাদের ইসলাম নতুন ইসলাম ইত্যাদি। প্রিয় ভাই, ভ্রাম্যমান স্কুলে কেন ডাক্তারি পড়ানো হয় না, সে প্রশ্ন কি কখনো করা হয়েছে? কিংবা প্রাইমারী স্কুলে কেন অর্থনীতি পড়ানো হয় না, সে প্রশ্ন কি কখনো এসেছে? তাহলে কেন একটি জামাত, যারা মূলত ইসলামের একেবারে মৌলিক কিছু বিষয় পাঠে ও পাঠদানে শ্রম দিচ্ছেন, তাদের প্রতি সমালোচনার তীর ছোড়া হচ্ছে?

সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে শুধু ঈমানের পরিচয় না জানা থাকাতে কত মুসলিম অমুসলিম হয়ে যাচ্ছেন, তা আমরা জানি কি? কত মুন্সী বাড়ী আজ ঈমানহারা তার হিসাব আছে কি? তাবলীগ জামাত দ্বীনের একটি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এবং ভ্রাম্যমান প্রতিষ্ঠান। এখানে কেন ওটা পড়ানো হয় না, কেন এটা হয় না, এসব প্রশ্ন অবান্তর। কী পড়ানো হচ্ছে, তা কতটুকু দরকার, তা-ই তো বিবেচ্য।

তাবলীগ জামাত যেন নির্বিঘ্নে পুরো পৃথিবীতে বিচরণ করতে পারেন, সেজন্য প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই এর সাথে রাজনীতির সম্পৃক্ততাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মুরুব্বীরা অত্যন্ত দূরদর্শী হয়েই তা করেছেন। বর্তমানকালে রাজনীতি মানুষে মানুষে বিদ্বেষ বুনে দেয়, অথচ তাবলীগ জামাত মানুষকে কাছে টানতে চায়। ‘হা’ এবং ‘না’ তো একই সময় এক সাথে হতে পারে না।

হ্যাঁ, এই জামাত থেকে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে যে কেউ উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। এরকম নজির অসংখ্য, যেখানে কেউ তাবলীগ জামাতের সংস্পর্শে আসার পর দ্বীনী মাদ্রাসায় পড়েছেন, বড় আলেম হয়ে দ্বীনের খিদমত করে যাচ্ছেন। কিংবা তাবলীগের সংস্পর্শে এসে নিজের সন্তানকে মাদ্রাসায় দিয়েছেন, সন্তান বড় আলেম হয়ে দ্বীনের খিদমত করে যাচ্ছেন।

বর্তমানকালে ইসলামের সবচেয়ে সুসংহত ও উৎসর্গিত প্রচারকদলের প্রতি এ নেতিবাচক সমালোচনা কার স্বার্থে, বা এর দ্বারা লাভবান কারা হচ্ছে, বিষয়টি ভাবার সময় এসেছে। তাই আসুন, আমরা জামাতটির সাথী হই, দ্বীন-প্রচারের এ গুরু দায়িত্বে নিজেকে সম্পৃক্ত করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাঁর দ্বীনের সেবক ও প্রচারক হওয়ার তাওফীক দিন। আমীন।

====

ইজতেমা উপলক্ষে প্রকাশিত ‘ইজতেমা প্রতিদিন’: ৩১/০১/২০১৪