প্রসঙ্গ সেন্টমার্টিন ট্রাজেডি – কিছু ভাবনা

সম্প্রতি বেশ কয়েকজন তরুণ সেন্টমার্টিনে বেড়াতে যান এবং তাদের মধ্যে কয়েকজন সাগরে ডুবে মারা যান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ব্যাপারটি সত্যিই দু:খজনক। আল্লাহ তায়ালা তাদের জীবনের সকল গোনাহ মাফ করে জান্নাত দান করুন, দোয়া করি। একই সাথে কর্তৃপক্ষের যথাযথ পদক্ষেপ দাবী করছি, যেন নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। কারণ যে রাষ্ট্রে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয় না, তা এমনিতেই উন্নতি করতে থাকে, সরকারের কোনো কসরত করতে হয় না।

যাহোক, ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে।

১. তারুণ্য – আনন্দ-উচ্ছ্বাসের নাম। আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন থাকে, থাকে বিশ্ব জয় করার অদম্য স্পৃহা। কোনো বাধা মানতে চায় না, শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকতে চায় না। মৃত্যুর কথা কল্পনাও করতে চায় না। অথচ কিয়ামতের দিন এ তারুণ্য নিয়েই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করা হবে। তারুণ্য ও যৌবন কোথায় নষ্ট করেছে, জানতে চাওয়া হবে। জবাব ছাড়া এক পা-ও নড়া যাবে না।

রাসূল স. বলেন, পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দেয়া ছাড়া কেয়ামতের দিন বান্দার দুই পা নড়বে না। ১. বান্দা তার জীবন কোথায় শেষ করেছে? ২. তার যৌবন/ তারুণ্য কীসে ব্যবহার করেছে? ৩. তার সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে? ৪. আর কোথায় তা খরচ করেছে? ৫. তার জ্ঞানানুযায়ী কী আমল করেছে? [তিরমিযী: ২৬০১]

২. হঠাৎ মৃত্যুকে আমরা অস্বাভাবিক মনে করি। অথচ মৃত্যু হঠাৎ আসাটাই স্বাভাবিক। বয়স হয়ে আশানুরূপভাবে মৃত্যু আসাটা বোনাস।

আল্লাহ তায়ালা বলেন (অনুবাদ), “যদি আল্লাহ লোকদেরকে তাদের অন্যায় কাজের কারণে পাকড়াও করতেন, তাহলে ভূপৃষ্ঠে চলমান কোন কিছুকেই ছাড় দিতেন না। কিন্তু তিনি প্রতিশ্রুত সময় পর্যন্ত তাদেরকে ছাড় দেন। অতঃপর নির্ধারিত সময়ে যখন তাদের মৃত্যু এসে যাবে, তখন এক মুহূর্তও বিলম্বিত কিংবা তরাম্বিত করতে পারবে না।” [আন-নাহল: ৬১]

তাই প্রস্তুত থাকতে হবে প্রতি মুহূর্তেই।

৩. ফেইসবুক ও অন্যান্য সামাজিক গণমাধ্যম বর্তমানে আমাদের আমলনামার অংশ। এতে কিছু রেখে যাওয়া মানে আজীবন তা থাকবে। ভালো কিছু রেখে গেলে তো ইনশা’আল্লাহ সাদাকায়ে জারিয়াহ হবে। তবে খারাপ কিছু রেখে গেলে দুটো সমস্যা। এক. নিজের গোনাহের স্বীকারোক্তি দিয়ে যাওয়া, বা সাক্ষী রেখে যাওয়া, যা একেবারেই অনুচিত। গোনাহের কথা, যদি হয়েই যায়, কারো কাছে প্রকাশ করা উচিৎ নয়। একমাত্র আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করা উচিৎ। দুই. এগুলো থেকে অন্য কেউ গোনাহ করতে উদ্বুদ্ধ হলে সেগুলোর দায়ভার কাঁধে বহন করা।

আমাদের ভাইয়েরা কত সহজেই একে অপরকে গালাগাল করেন, অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করেন, অশ্লীলতা ছড়ান। এ সবই কাউন্ট হবে, স-ব-ই।

এ কথাগুলো বিশেষ করে সম্প্রতি সোশাল মিডিয়ায় ফ্ল্যাশ-মব-মাতলামোর সময় বেশি বেশি মনে হচ্ছিল।

আল-কুরআনে লুকমান আ. এঁর পুত্রকে উদ্দেশ্য করে তাঁর বক্তব্য: “হে বৎস, কোন বস্তু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় অতঃপর তা যদি থাকে প্রস্তর গর্ভে অথবা আকাশে অথবা ভূ-গর্ভে, তবে আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ গোপন ভেদ জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন।” [লুকমান: ১৬]

কাজেই আমরা প্রোফাইলে কী রেখে যাচ্ছি, তা ভাবা দরকার।

৪. আরেকটা বিষয়। দুর্ঘটনার পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে দেখলাম স্ট্যাটাস দিলেন অনেকটা এমন, “সাঁতার না জানলে তো মরবেই, এতে এত কী হলো!”। নি:সন্দেহে মৃত্যুকে এতটা তুচ্ছভাবে তুলে ধরাটা মানসিক বিকৃতির পরিচায়ক। কিন্তু এই স্ট্যাটাসের মন্তব্যে অন্যদের যেসব মন্তব্য দেখলাম, তা চিন্তাই করা যায় না। পরের দিনই ছেলেটার হাড্ডি ভেঙে / ডুবিয়ে মারার প্রকাশ্য হুমকি থাকল (জানি না শেষ পর্যন্ত তার ভাগ্যে কী জুটেছে), আর বাবা-মা তুলে গালাগাল তো আছেই। অথচ মন্তব্যকারীরাও অত্যন্ত ভদ্র ঘরের সন্তান, অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এসব দেখে মনে হচ্ছিল, ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়ায় আমাদের ফুলের মতো ফিতরাহ বা স্বাভাবিক সেন্স/পছন্দ/অপছন্দ বিকৃত হয়ে গেছে।

রাসূল স. বলেন, প্রত্যেক শিশুই ফিতরাহ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। পরে তার পিতামাতা (চারপাশ) তাকে ইহুদী-নাসারা বানিয়ে থাকে। [বুখারী: ১৩৮৫]

হাদীসটির ব্যাখ্যায় বলা হয়, কোনো শিশু জন্ম নেয়ার পর তাকে যদি একটি ঘরে আবদ্ধ করেও রাখা হয়, কোনো শিক্ষক ছাড়াই সে প্রাপ্ত বয়সে ওই ফিতরাহ বা জন্মগত কমন সেন্সের আলোকে আল্লাহকে চিনতে পারবে। এ বিষয়ে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাও একবার শেয়ার করেছিলাম। (লিংক: http://yousufsultan.com/every-child-is-a-believer-in-god-by-born/)

তো, আমাদের ফিতরাহ মনে হচ্ছে নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা এমনসব কথা বলছি, আচরণ করছি, যা স্বাভাবিক নয়।

সবমিলিয়ে প্রতিটি মৃত্যুই যেন আমাদের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকে। নিহতদের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, শিক্ষকমণ্ডলী ও প্রতিষ্ঠানসমূহকে আল্লাহ তায়ালা সবর করার তাওফীক দিন। আমীন।