ইসলামী অর্থনীতি : প্রয়োজন আলেমদের ব্যাপক অংশগ্রহণ

এক.

আল্লাহ তা’আলা আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের উদ্দেশে [1]। ইবাদত সুষ্ঠুভাবে করার জন্য প্রয়োজন ভালোভাবে বেঁচে থাকা। বাঁচার জন্য প্রয়োজন অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান। আর সে জন্যই তিনি সৃষ্টি করেছেন শস্য-ফলমূল ইত্যাদি নানা রকম খাবার, যা খেয়ে বাঁচা যায়। বুদ্ধি দিয়েছেন আধুনিক আবাসনের, বিভিন্ন মেশিনারিজ ও অত্যাধুনিক যানবাহনের। এ সবই আমাদের ভালোভাবে বেঁচে থেকে সুষ্ঠুভাবে ইবাদতে মনোযোগী হতে সাহায্য করে।

বাঁচার জন্য অন্যতম প্রয়োজন হলো একজনের মালিকানাধীন কোনো কিছুকে আরেকজনের মালিকানার বস্তুর সাথে বিনিময় করা। সে লক্ষ্যে মানুষ শুরু করল ব্যবসা-বাণিজ্য। যাকে কেন্দ্র করতে ঘুরতে শুরু করল অর্থনীতির চাকা।

ইসলাম মানুষের সহজাত ধর্ম [2]। কিছু জায়গায় কিছু বিধিনিষেধ ছাড়া সামগ্রিকভাবে ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক কার্যক্রম, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদিকে স্বীকৃতি দেয়। আমরা দেখি, ইসলামপূর্ব যুগে মানুষ বাঁচার তাগিদে, জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যবসা পরিচালনা করে এসেছে। ইসলাম এসে ব্যবসাকে শুধু স্বীকৃতিই দেয়নি, বরং তাকে সবচেয়ে পবিত্র উপার্জন বলে ঘোষণা দিয়েছে, যদি তা ইনসাফ ও আমানতের সাথে করা হয় [3]।

রাসূলুল্লাহ স. নিজেও বিবাহের আগ থেকেই খাদিজা রা. –এর সাথে মুদারাবার ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনা করে এসেছেন [4]। ওমর রা. এর ঘটনা আমরা জানি, তিনি ব্যবসা পরিচালনার জন্য অন্য এক সাহাবীর সাথে পালাবদল করে রাসূলের স. দরবারে হাজিরা দিতেন ।

তবে ব্যবসার নামে কোনো লেনদেন যেন শোষণের হাতিয়ার না হয়, সে জন্য ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে রিবা [5], ক্বিমার, মাইসির [6], গারার, গাবান ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়কে। যথাসম্ভব একটা লেনদেন যেন পরস্পরিক সন্তুষ্টি আর শুভাকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে নিষ্পন্ন হয়, ইসলাম তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। যখনই কোনো চুক্তিতে তানাযু বা বিবাদের সম্ভাবনা থাকে, ইসলাম তা যথাসম্ভব দূর করার চেষ্টা করে থাকে।

দুই.

বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মূলধন একত্রকরণ এবং তা বিভিন্নভাবে বিনিয়োগের জন্য বিশ্বব্যাপী চালু হয় ব্যাংক ব্যবস্থা। ১৩৯৭ খৃষ্টাব্দে সবচেয়ে পুরনো ব্যাংকের সন্ধান মেলে [7]।

ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক প্রারম্ভ হয় বলা যায় ১৯৭০ এর শুরুর দিকে। বিভিন্ন মুসলিম দেশের অর্থমন্ত্রীদের নিয়ে পাকিস্তানের করাচীতে একটি কনফারেন্স হয় ১৯৭০ -এ। এরপর প্রথম আন্তর্জাতিক ইসলামিক কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় মক্কায় ১৯৭৬ সনে। ১৯৭৫ এ আইডিবি বা ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা এ যাত্রাকে আরো বেগবান করে [8]।

১৯৯১ সনের ২৭ই মার্চ বাহরাইনে অলাভজনক স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয় ইসলামী অর্থনীতির মানদন্ড প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান AAOIFI (Accounting and Auditing Organization for Islamic Financial Institutions) এর। বিশ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বিশ্বে সর্বাধিক স্বীকৃত শরীয়াহ মানদন্ড প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান। এ পর্যন্ত প্রণীত প্রায় ৮৫টি মানদন্ড একাউন্টিং, অডিটিং, গভর্ণিং ও শরীয়াহ বিষয়ে প্রায় সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত করে। বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী ইসলামী অর্থনীতিবীদ আলেমগণ এসব মানদন্ড প্রণয়নে গবেষণা ও পর্যালোচনা করে থাকেন। বর্তমানে এর শরীয়াহ বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় মুফতী তাকী উসমানী হাফিজাহুল্লাহ [9]।

এওফী ছাড়াও আরো কিছু প্রতিষ্ঠান ইসলামী অর্থনীতির মানদন্ড নির্ধারণে কাজ করে আসছে। তন্মধ্যে বাহরাইন ভিত্তিক আল বারাকা সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিক্স [10], মালেশিয়ার সেন্ট্রাল ব্যাংক ‘ব্যাংক নেগারা মালেশিয়ার’ শারিয়াহ এ্যাডভাইজরী কাউন্সিল [11] অন্যতম। এছাড়া সউদী আরব ভিত্তিত আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমী [12] তো আছেই।

তিন.

শরীয়াহ মানদন্ড নির্ধারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিশ্বের বড় বড় আলেমগণ অক্লান্ত পরিশ্রম করা সত্ত্বেও ইসলামী ব্যাংকি ও ইসলামী অর্থনীতি এখনো অনেকটা স্বপ্নই রয়ে গেছে। ইসলামী ব্যাংকিংয়ে ‘ব্যাংকিং’ যতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, ‘ইসলাম’ ততটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। এর কারণ অনুসন্ধান করে অনেকে অনেক রিপোর্ট দিচ্ছেন।

তবে সব কারণ সামনে রেখে যেটা সবচেয়ে বেশি প্রকট মনে হয়, তা হলো, শ্রদ্ধেয় আলেম সমাজের ‘প্রায়’ নির্লিপ্ততা। বরং অনেক ক্ষেত্রে, তাঁদের অনাগ্রহ এবং অস্বীকৃতি।

ইসলামী ব্যাংকিং সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ:

১. ব্যাংকিং পদ্ধতিকে ইসলামীকরণের উপায় প্রণয়ন ও মানদন্ড নির্ধারণ। এ কাজটি যথেষ্ট যত্ন সহ করা হচ্ছে, যা আমরা পূর্বেই বলেছি। এখন শুধু প্রয়োজন, প্রণীত এসব মানদন্ডকে সিলেবাসে অন্তর্ভুক্তকরণ এবং সেগুলো নিয়ে আলোচনা পর্যালোচনা করা।

২. যারা ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম করবেন, ইসলামী ব্যাংকার, তাদের কাছে প্রকৃত ইসলামী ব্যংকিং রূপরেখা তুলে ধরা এবং পর্যাপ্ত ট্রেইনিংয়ের ব্যবস্থা করা। – এ কাজটির অভাব খুব স্পষ্ট। আমাদের দেশে ইসলামী ব্যাংকিং চালু হয়েছে প্রায় ত্রিশ বছর আগে। অথচ এখনো একটি ইউনিভার্সিটি নেই, যাতে ইসলামী অর্থনীতির জন্য আলাদা অনুষদ আছে; যেখানে ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, পর্যালোচনা হচ্ছে। যারা সুদভিত্তিক ব্যাংকব্যবস্থা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, তারাই ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফল যা হওয়ার, তা-ই হচ্ছে।

শুধু ইউনিভার্সিটিতে অনুষদ থাকলেই হবে না। এক্ষেত্রে এগিয়ে এসে নেতৃত্ব দিতে হবে আলেমদের। যারা শরীয়তের নুসুস ও ফিকহ সম্পর্কে প্রাজ্ঞ; ইসলামী অর্থনীতি বিষয়ে আধুনিক গবেষণার ব্যাপারে যথেষ্ট ওয়াকিফহাল।

অনেক প্রশ্ন আছে, যেগুলোর উত্তর আলেমরাই ভালো দিতে পারবেন। তাছাড়া যেহেতু এখানে ‘ইসলাম’ সর্বাগ্রে, তাই ইসলামের কর্ণধার আলেমদেরই এর হাল ধরতে হবে।

৩. ইসলামী ব্যাংকার ও ইসলামী ব্যাংকিংয়ের গ্রাহকদের কাছে ইসলামী অর্থনীতির উপযোগিতা, প্রয়োজনীয়তা ও সচেতনামূলক ভাবে তুলে ধরতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে এমন হয় যে, ব্যাংকার ইসলামী পদ্ধতিতে লেনদেন করতে চাচ্ছেন, কিন্তু গ্রাহক চাচ্ছেন না। আবার গ্রাহক চাচ্ছেন, কিন্তু ব্যাংকার চাচ্ছেন না। এক্ষেত্রে পাক্ষিক বা মাসিক আলোচনা সভার আয়োজন করা যেতে পারে, যেখানে শ্রদ্ধেয় আলেম আলোচনা করবেন।

মোটকথা, আলেমদের আরো বেশি করে ইসলামী অর্থব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত হতে হবে। মাদ্রাসার পাঠ্যসূচী, দারস-তাদরীস, লেখালিখি, জুমার বয়ান, ওয়াজ মাহফিল, সেমিনার সব ক্ষেত্রেই যেন এ বিষয়ে বেশি বেশি আলোচনা উঠে আসে, সে ব্যবস্থা করতে হবে।

একটি ইসলামী ব্যাংকের জন্য ব্যাংকিং কার্যক্রম যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটুকু, বরং তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সে কার্যক্রম শারীয়াহ মানদন্ডে উত্তীর্ণ কিনা, তা নিশ্চিত করা। অথচ ব্যাংকিংয়ের জন্য হাজারো পার্মানেন্ট কর্মজীবী থাকলেও শারীয়াহ মান নিশ্চিত করার জন্য থাকে না একজন পার্মানেন্ট আলেমও। এর কারণ যদি বলা হয়, ম্যানেজমেন্টের অনাগ্রহ, তাহলে তা সম্পূর্ণ সঠিক হবে না। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকাও এর অন্যতম কারণ। আর তাই একই আলেমকে বিভিন্ন শারীয়াহ বোর্ডের সদস্য হতে হচ্ছে। ফল যা হওয়ার, তা-ই হচ্ছে। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক তথা শারীয়াহ মান সুনিশ্চিত করণের ক্ষেত্রে বেশি অবহেলা হচ্ছে।

এর সমাধান একটাই। এ ময়দানে আলেমদের আরো অনেক বেশি অংশগ্রহণ। হালাল বিষয়ে সুনিশ্চিত সমাধান না দিলে জনসাধারণকে হারামে লিপ্ত করার দায় কিছুটা আলেম সমাজের ওপরও আসে। তা ভাবার সময় বোধ করি চলেই এসেছে!

 


[1] আল-কুরআন, ৫১:৫৬, “আমার এবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি।“

[2] সহীহ বুখারী: ১৩৮৫; আল-কুরআন, ৩০:৩০

[3] বায়হাকী – শুয়াবুল ঈমান

[4] আল বিদায় ওয়ান নিহায়া

[5] আল-কুরআন, ২:২৭৫

[6] আল-কুরআন, ৫:৯০