প্রশ্ন : স্মাইলি বা ইমোটিকন ব্যবহার কি জায়েজ?

প্রশ্ন : As Salamu Alaikum Janab, One of my friends wanted to know from you about the permissibility of using smilies or emoticons during chat. Because these are animated images. And they also help to express the emotion easily.
He specially mentioned your name as he wants to know the fatwa from someone who is a real internet user.

(আসসালামু আলাইকুম। আমার এক বন্ধু আপনার কাছ থেকে স্মাইলি বা ইমোটিকন ব্যবহারের বিধান জানতে চেয়েছেন। যেহেতু এগুলো এ্যানিমেটেড ছবি, তাই সন্দেহ হচ্ছে। আবার এগুলো দিয়ে ইমোশন প্রকাশও খুব সহজ। আমার বন্ধুটি বিশেষভাবে আপনার নাম বলেছে, কেননা সে এমন আলেমের কাছ থেকেই বিষয়টা জানতে চায়, যিনি বাস্তবে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন।)

উত্তর : ওয়ালাইকুম আসসালাম। আপনার প্রশ্নের উত্তরকে আমরা কয়েক ভাগে ভাগ করে নিচ্ছি।

১. ভূমিকা : প্রাণীর ছবি অঙ্কনের ব্যাপারে কুরআন-হাদীসের নিষেধাজ্ঞা।
২. ছোট ছবি আর বড় ছবির বিধানে সমতা।
৩. ছবির মূল অংশ কোনটা?
৪. স্মাইলির প্রকারভেদ ও বিধান।
৫. সতর্কতা।

নিম্নে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করব ইনশা’আল্লাহ।

এক.

যে কোনো প্রাণসমৃদ্ধ প্রাণীর চিত্রকর্ম অঙ্কনের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান সুস্পষ্ট। তা হলো, হারাম। এ ব্যাপারে এত হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, ফকীহগণ বলেন, অর্থের দিক থেকে সেগুলো মুতাওয়াতির (ধারাবাহিক অবিচ্ছেদ্য সূত্রের) পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

আমরা নিম্নে কয়েকটি হাদীস তুলে ধরছি।

১. আব্দুল্লাহ বিন উমর রা: বলেন, নবী স: বলেছেন, “এই সব চিত্রকর্মের শিল্পীদের খুব শাস্তি দেয়া হবে। বলা হবে, তোমরা যা সৃষ্টি করেছ, তাতে প্রাণ দাও তো।”(বুখারী:২য় খন্ড, পৃ:৮৮০, মুসলিম:২য় খন্ড, পৃ:২০১, রশীদীয়া লাইব্রেরী দিল্লী) (বুখারী:৫৯৫১, মুসলিম:২১০৭)

২. ইবনে আব্বাস রা: বলেন, আমি নবীজী স: কে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি পৃথিবীতে কোন প্রতিকৃতি তৈরি করবে তাকে কিয়ামতের দিন বাধ্য করা হবে যেন সে তাতে প্রাণ সঞ্চার করে, অথচ সে তা করতে সক্ষম হবে না।” (বুখারী:৫৯৬৩, মুসলিম:২১১০)

৩. আবু হুরায়রা রা: বলেন, “আমি নবীজীকে স: বলতে শুনেছি, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তার চেয়ে জালিম আর কে হতে পারে, যে আমার সৃষ্টির ন্যায় কিছু সৃষ্টি করে? পারলে একটি শস্য দানা বা একটি গম বা একটি যব সৃষ্টি করুক তো..।” (বুখারী:২:৮৮০, মুসলিম:২:২০২) (বুখারী:৫৯৫৩, মুসলিম:২১১১)

৪. আয়েশা রা: বলেন, “একদা নবী স: আমার ঘরে আসলেন। আমি তখন ছবি আছে এমন একটি চাদর আড়াল করে রাখছিলাম। নবীজীর স: চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল, তিনি তা নিয়ে ছিড়ে ফেললেন। এরপর বললেন, কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশী শাস্তি তাদের হবে যারা আল্লাহর সৃষ্টির সাদৃশ্য করে।” (বুখারী:২:৮৮০, মুসলিম:২:২০০)

এভাবে প্রায় বারো জন সাহাবী নবীজী স: হতে মানুষ ও জীব-জন্তুর চিত্র-প্রতিকৃতি নির্মাণে নিষেধাজ্ঞার হাদীস বর্ণনা করেছেন। যার সবকটির মর্ম প্রায় একই রকম। (এ সম্পর্কে আরো হাদীস এবং আয়াত পড়ুন : http://yousufsultan.com/posts/are-sculptures-allowed-in-islam-a-research/)

এসব হাদীসের ভিত্তিতেই প্রখ্যাত হাদীসবেত্তা ইমাম নববী রহ. বলেন, এ ব্যাপারে হাদীস বিশারদগণ একমত যে রূহ বিশিষ্ট প্রাণীর প্রতিকৃতি বানানো নিষিদ্ধ এবং হারাম। (ফাতাওয়াল ইসলাম, প্রশ্ন নং:৭২২২ ও ২০৮৯৪, মাকতাবা শামেলা)

ইমাম নববী তাঁর বিখ্যাত হাদীস সংকলন ‘রিয়াদুস সালেহীনে’ “ باب تحريم تصوير الحيوان في بساط أو حجر أو ثوب أو درهم أو دينار أو مخدة أو وسادة وغير ذلك ، وتحريم اتخاذ الصورة في حائط وسقف وستر وعمامة وثوب ونحوها ، والأمر بإتلاف الصورة” নামে একটি অধ্যায়ের নামকরণ করেন।

অর্থ : অধ্যায় : বিছানা, পাথর, কাপড়, দিরহাম, দীনার, বালিশ, কুশন, দেয়াল, ছাদ, পর্দা, পাগড়ী ইত্যাদিতে জীব-জন্তুর ছবি আঁকা হারাম হওয়া এবং এসব ছবি নষ্ট করার নির্দেশ সম্পর্কিত হাদীস।

এতে বোঝা যায় যে, হাদীসের আলোকে তিনি সব রকম প্রাণীর ছবি বা মূর্তি আঁকা বা নির্মাণ করা হারাম মনে করতেন। এবং এ ব্যাপারে তিনি ফকীহদের ঐক্যমত্যও দাবী করেন। (দেখুন : http://www.islam-qa.com/ar/ref/78963)

দুই.

পূর্বের হাদীসগুলো থেকে বোঝা যায়, ছবি বড় হোক আর ছোট হোক, অঙ্কন করা বা বানানো হারাম। ইমাম নববীর হাদীসের অধ্যায়ের নামকরণ ব্যাপারটিকে আরো পরিস্কার করে তোলে। নিম্নে হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য সূত্রেও এর সমর্থন মেলে।

রাদ্দুল মুহতার / ফাতওয়ায়ে শামিয়াহ :

حاشية ابن عابدين – (ج 1 / ص 647 دار الفكر للطباعة والنشر)

قلت لكن مراد الخلاصة اللبس المصرح به في المتون بدليل قوله في الخلاصة بعد ما مر أما إذا كان في يده وهو يصلي لا يكره وكلام النووي في فعل التصوير ولا يلزم من حرمته حرمة الصلاة فيه بدليل أن التصوير يحرم ولو كانت الصورة صغيرة كالتي على الدرهم أو كانت في اليد أو مستترة أو مهانة مع أن الصلاة بذلك لا تحرم بل ولا تكره لأن علة حرمة التصوير المضاهاة لخلق الله تعالى وهي موجودة في كل ما ذكره

حاشية ابن عابدين – (ج 1 / ص 648 دار الفكر للطباعة والنشر.)

قوله ( أو مقطوعة الرأس ) أي سواء كان من الأصل أو كان لها رأس ومحي وسواء كان القطع بخيط خيط على جميع الرأس حتى لم يبق له أثر أو يطليه بمغرة أو بنحته أو بغسله لأنها لا تعبد بدون الرأس عادة وأما قطع الرأس عن الجسد بخيط مع بقاء الرأس على حاله فلا ينفي الكراهة لأن من الطيور ما هو مطوق فلا يتحقق القطع بذلك وقيد بالرأس لأنه لا اعتبار بإزالة الحاجبين أو العينين لأنها تعبد بدونها وكذا لا اعتبار بقطع اليدين

ফাইযুল বারী :

فيض الباري شرح صحيح البخاري – (ج 2 / ص 133)
وله: (أو تصاوير) عطف على المعنى. كما في «المغني»، أن العطف قد يكون على اللفظ، وقد يكون على المعنى، وقد يكون على التوهم.
واعلم أن هناك ثلاث مسائل: الأولى: فعل التصوير، وهو حرامٌ، صغيرًا كان أو كبيرًا.)
والثانية: حكم التصاوير في الصلاة. وحاصل ما في المتون: أن لا بأس بالمُمتَهن والصغيرة جدًا، بحيث لا تبدو للناظر وإلا كرهت.
والثالثة: لُبْس الثوب المصور.
وراجع التفصيل من «الفتح» لابن الهُمَام من مكروهات الصلاة، و «الموطأ» لمحمد بن الحسن.

তিন.

ছবির ক্ষেত্রে মূল হলো ছবির চেহারা বা মুখমন্ডল। চেহারা কর্তিত ছবি হলে তা হারাম থাকে না।

রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন, الصورة الرأس ، فإذا قطع الرأس فلا صورة (ছবি হলো মাথার অংশ। মাথা কেটে ফেললে তা আর ছবি থাকে না।)

ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, আলবানী বলেছেন : সহীহ। (আস সিলসিলাতুস সাহীহাহ : ১৯২১)

পক্ষান্তরে শুধু চেহারা থাকলে সেটাও ছবির নিষেধাজ্ঞায় পড়বে। উপরোক্ত হাদীস থেকে তা-ই প্রমাণিত হয়। তা ছাড়া শুধু মাথা বা মুখমন্ডলের ছবি নিষেধাজ্ঞা থেকে বের হওয়ার কোনো দলীল নেই।

চার.

স্মাইলি বা ইমোটিকন দুই ভাবে ব্যবহৃত হয়।

১. মুখমন্ডলের ছবি। এটা আবার কয়েক রকম। ছোট, বড়। স্টিল ছবি, এ্যানিমেটেড ছবি ইত্যাদি। পূর্বোক্ত আলোচনার দ্বারা বোঝা যায় যে, মুখমন্ডল আঁকাও প্রাণীর সম্পূর্ণ ছবি আঁকার নামান্তর। আবার ছবি ছোট হওয়ায় বিধানে কোনো তারতম্য হয় না। তাই এ ধরনের ছবিযুক্ত স্মাইলি বা ইমোটিকন ব্যবহারের বিধান ছবি অঙ্কনের বিধানের ন্যায় (হারাম) হবে বলেই মনে হয়।

উপরোক্ত বক্তব্যের সমর্থন :

২. শুধু কোলন আর ব্র্যাকেটের সমন্বয়ে। বা শুধু অক্ষর যোগে।

যেমন, :) :( :D ;) ইত্যাদি।

যেহেতু এসবে মুখের বা চেহারার কোনো আকৃতি থাকে না, নিছক কিছু অক্ষরের সমন্বয়ে হয়ে থাকে, তাই এসবের ব্যবহার ছবি অঙ্কনের বিধানের অধীন হবে না।
তাছাড়া এসবে কোনো চোখ, নাক, চেহারা অঙ্কন করা হয় না। আর হাদীসে বর্ণনা এসেছে যে, ছবি হলো সেটা, যেটাতে মাথা/মুখমন্ডল থাকে।

উপরোক্ত বক্তব্যের সমর্থন :

পাঁচ.

যদিও অক্ষরের সমন্বয়ে সৃষ্ট স্মাইলি ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে, তবু তার ব্যবহার কেবল একই জেন্ডারের মানুষের সাথে চ্যাটিংয়ে সীমাবদ্ধ রাখা উচিৎ। কেননা বিপরীত জেন্ডারের সঙ্গে চ্যাটিংয়ে এসবের ব্যবহারে -যদি তিনি মাহরাম (যার সাথে কথা বলা, দেখা দেয়া জায়েয) না হন- তার চেহারার কল্পনা আসা খুবই স্বাভাবিক। যার সম্ভাবনাময় পরিণতি হলো অশ্লীল কল্পনা, যা হারাম। কাজেই এসব থেকে বিরত থাকা উচিত।

উল্লেখ্য যে, অধিকাংশ আলেমগণ বিপরীত জেন্ডারের (গায়র মাহরাম) সাথে শুধু তখনই চ্যাটিংয়ের অনুমতি দিয়েছেন, যখন একান্ত প্রয়োজন হবে, এবং যখন তা ফোরাম বা এমন কোনো উন্মুক্ত পরিসরে হবে। ব্যক্তিগত চ্যাটিং, ই-মেইলকে কখনো তারা অনুমতি দেন নি।

আরো পড়ুন : http://www.islam-qa.com/ar/ref/34841

আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। আমীন।