তাবলীগ জামাত সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু প্রশ্ন

প্রশ্ন : আস-সালামু আলাইকুম।অনেক ব্যস্ততার মাঝে কেমন আছেন ভাই?আর টিভি তে আপনের প্রোগ্রাম কেমন হচ্ছে ভাই,অনেক ইচ্ছা থাকা সত্বে ও দেখতে পারি না ৯-৬টা চাকুরির কারনে।দোয়া করি আল্লাহ তা’লা আপনাকে দীন ইসলামের বেশি বেশি খিদমত করার তওফিক দ্বীন।

অন্যান্য ইসলামী সংগঠনের মত আমি তাবলীগ জামাতকে পছন্দ করি,কারন আমি ইসলামকে ভালবাসি।আমি চেষ্টা করি যখনই যেখান থেকে সুযোগ পাই ইসলাম থেকে জানতে যদি কেউ সহিহ সুন্নাহ-হাদিসের ভিত্তিতে কথা বলে।আমি তাবলীগ জামাতের সাথে মিশতে চাই কিন্ত ওদের অনেক জিনিষ আমার কাছে খটকা লাগে, তাই আমি আজ এসেছি কিছু তাবলীগ জামাতের ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন নিয়ে।আমি জানি ভাই আপনি অনেক ব্যস্ত,কিন্ত আপনি যদি আপনার ব্যস্ততার ফাকে একটু সময় আমাকে দেন তাহলে আমার অনেক অনেক বড় উপকার হয়,আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে যে আমি পুরোপুরি তাবলীগের সাথে জড়াব কিনা।

১.ফাজায়েলে আমল কতটুকু গ্রহনযোগ্য যেখানে সহীহ হাদীস গ্রন্থের(বোখারী/মুসলিম ইত্যাদি)কোন রেফারেন্স নাই।কিন্ত মুন্তাখাব হাদীসের রেফারেন্স রয়েছে।

২.ওরা বলে ঈমানের দাওয়াত দিলে ঈমান বাড়ে,তাই নিজের ঈমান বাড়ানোর জন্য ওরা ঈমানের দাওয়াত দেয়।কথাটা কতটুকু গ্রহন যোগ্য?কোন সহিহ রেফারেন্স আছে কি?

৩.ওরা প্রায়ই এ আয়াতের ব্যাখ্যা দেয় “তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি,তোমাদের বের করা হয়েছে মানুষের কল্যানের জন্য………” তাই ওরা মানুষকে দাওয়াত দেয়ার পথে বের হয়।আসলে এটা কি আমাদের মত আম জন-সাধারনের দায়িত্ব নাকি যারা জানে(যেমনঃ আলিম) তাদের দায়িত্ব?

৪.ওরা বলে দাওয়াতের কাজ করার জন্য আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন।(বিদায় হজ্জের ভাষনে “আজ আমার কথা তাদের মাঝে পৌছে দাও যারা অনুপস্থিত………”) তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের নির্দেশে অনেক অনেক সাহাবী(রাঃ) দেশ দেশান্তরে বের হয়ে গিয়েছিলেন ঈমানের দাওয়াত দেয়ার জন্য।তাই তাবলিগী ভাইয়েরা ও ঈমানের দাওয়াত দেয়ার জন্য বের হন।এটাকে ওনারা বলেন “নবী ওয়ালা দায়িত্ব” যা নবীজী(সাঃ) ওনার উম্মতের জিম্মায় রেখে গেছেন।
আসলে তা কতটুকু সহীহ।আর ওনারা যে পদ্ধতিতে এই দায়িত্ব পালন করেন তা কতটুকু সহীহ?

৫.ওনারা এই বের হওয়াকে “আল্লাহ’র পথে” বের হওয়া বলেন।এভাবে আল্লাহ’র পথে বের হওয়ার যে পদ্ধতি ওনারা অনুসরন করেন(যেমনঃ দুরের মসজিদে ৩/৭/৪০ দিনের চিল্লায় বের হওয়া) এটা কি সহিহ?

৬. ৩/৭/৪০ দিনের চিল্লার ভিত্তি কি?আমার মনে হয় একটা হাদীস আছে যে “যে একাধারে ৪০ দিন তাকবীরে ঊলা’র সাথে জামাতে শরীক হবে,তার অন্তর থেকে আল্লাহ তা’লা মুনাফেকী দূর করে দিবেন বা এ জাতীয় কিছু……”

৭.ওনারা বলেন এভাবে আল্লাহ’র পথে বের হয়ে এক রাকাত নামাজ ৪৯ কোটি রাকাত নামাজের সমান যেটা কা’বা শরীফের ১ লাখ রাকাতের চেয়ে অনেক বেশি ছোয়াব/মর্যাদা পুর্ন। তা কি সত্যি? এভাবে আল্লাহ’র পথে বের হয়ে এক টাকা ব্যয় করা সাতশত টাকার সমান ছোয়াব। কোন সহিহ হাদীস কি আছে এ ব্যাপারে?

৮.আসলে কোন কোন কাজ করলে তাকে আল্লাহ’র রাস্তায় থাকা বলা যায়?উনাদের রাস্তা কি তালিবে ঈ’লমের রাস্তা নাকি আল্লাহ রাসুল (সাঃ) বর্নিত সত্যই আল্লাহ’র রাস্তা যে রাস্তায় থেকে মারা গেলে শহীদের মর্যাদা পাওয়া যাবে।

৯.আল্লাহ তা’লা বলেছেন সৎ কাজের আদেশ দিতে এবং অসৎ কাজের বাধা প্রদান করতে।কিন্তু “অসৎ কাজের বাধা প্রদানের” ক্ষেত্রে তাবলীগ জামাতের নিশ্চুপ ভাব আমাকে ব্যাথিত করে।(যেমনঃ সাম্প্রতিক সময়ে নারী নীতি,সংবিধানে ইসলাম,বিসমিল্লাহ ইত্যাদি ব্যাপার)।

আমি তাবলীগসহ ইসলামের সবাইকে ভালবাসি।আমি কোন রাজনইতিক/ইসলামি দলের সাথে জড়িত না কিন্তু মনে প্রানে চাই সমাজবদ্ধভাবে কোন ইসলামি দলের সাথে জড়াতে। কেননা রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন ইসলামী জিন্দেগি হলো সামাজিক জিন্দেগীর জীবন,যে এই সমাজ থেকে একা থাকবে তাকে শয়তান এমন ভাবে বিপথ গামী করবে যেভাবে বাঘ বকরীর পাল থেকে বিছিন্ন বকরীকে খেয়ে ফেলে।

আল্লাহ তা’লা বলেছেন আমি যা জানি না তা বিজ্ঞের কাছ থেকে জেনে নিতে।ভাই আমি আপনার শরনাপন্ন হলাম।আপনার মুল্যবান সময় থেকে আমার জন্য একটু সময় বের করবেন যেন আপনার একজন ভাই আপনার কাছ থেকে কোরআন ও সুন্নাহের জ্ঞানময় ও মুল্যবান পরামর্শ পায়।আল্লাহ তা’লা আপ নাকে উত্তম ক ল্যান দান করুন ও আপনার প্রতি শান্তি ও রহমত বর্ষন করুন।আমীন।আমার প্রশ্নগুলো আপনার ইমেল থেকে শুরু করে আপনের ওয়েবসাইট সব জায়গায় পাঠালাম যেন আপনার নজর এড়িয়ে না যায়।

উত্তর :

ওয়ালাইকুম আসসালাম।

আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর :
১.ফাজায়েলে আমল কতটুকু গ্রহনযোগ্য যেখানে সহীহ হাদীস গ্রন্থের(বোখারী/মুসলিম ইত্যাদি)কোন রেফারেন্স নাই।কিন্ত মুন্তাখাব হাদীসের রেফারেন্স রয়েছে।

এখানে বুখারী, মুসলিম শরীফের রেফারেন্সও আছে। যেগুলো বুখারী-মুসলিম এ নেই, সেগুলো অন্য কিতাব থেকে আনা হয়েছে। এটা কোনো সমস্যা নয়।

২.ওরা বলে ঈমানের দাওয়াত দিলে ঈমান বাড়ে,তাই নিজের ঈমান বাড়ানোর জন্য ওরা ঈমানের দাওয়াত দেয়।কথাটা কতটুকু গ্রহন যোগ্য?কোন সহিহ রেফারেন্স আছে কি?

ঈমানের দাওয়াতের অর্থ ঈমানের কথা বলা। এ কথা নি:সন্দেহ যে, যে বিষয়ের কথা বলা হয়, চর্চা হয়, সে বিষয়ে অভিজ্ঞতা বাড়ে বৈ কমে না।

৩.ওরা প্রায়ই এ আয়াতের ব্যাখ্যা দেয় “তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি,তোমাদের বের করা হয়েছে মানুষের কল্যানের জন্য………” তাই ওরা মানুষকে দাওয়াত দেয়ার পথে বের হয়।আসলে এটা কি আমাদের মত আম জন-সাধারনের দায়িত্ব নাকি যারা জানে(যেমনঃ আলিম) তাদের দায়িত্ব?

যার যতটুকু জ্ঞান আছে, ততটুকুই অন্যের কাছে পৌঁছে দেয়া উচিৎ। এখানে সাধারণ আর আলেমের কোনো পার্থক্য নেই। আলেম হলেই সব জানা থাকবে, না হলে কিছুই জানবে না এমনটি নয়। বরং প্রকৃত আলেম সে-ই, যে যতটুকু জানে তার ওপর আমল করে।

৪.ওরা বলে দাওয়াতের কাজ করার জন্য আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন।(বিদায় হজ্জের ভাষনে “আজ আমার কথা তাদের মাঝে পৌছে দাও যারা অনুপস্থিত………”) তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের নির্দেশে অনেক অনেক সাহাবী(রাঃ) দেশ দেশান্তরে বের হয়ে গিয়েছিলেন ঈমানের দাওয়াত দেয়ার জন্য।তাই তাবলিগী ভাইয়েরা ও ঈমানের দাওয়াত দেয়ার জন্য বের হন।এটাকে ওনারা বলেন “নবী ওয়ালা দায়িত্ব” যা নবীজী(সাঃ) ওনার উম্মতের জিম্মায় রেখে গেছেন।
আসলে তা কতটুকু সহীহ।আর ওনারা যে পদ্ধতিতে এই দায়িত্ব পালন করেন তা কতটুকু সহীহ?

এটি ‘بلغوا عني و لو آية’  হাদীসের অর্থ। রেফ : সহীহ বুখারী : ৩৪৬১, তিরমিযী : ২৬৬৯ (http://yousufsultan.com/posts/reference-of-hadith-balligu-anni-walao-ayah/


তাদের পদ্ধতিতে রয়েছে কালেমা, নামায, রোযা, যাকাত, হজ্জ্ব, সামাজিক আচার-আচরণ ইত্যাদির শিক্ষা। এটাকে আমরা রাসূলের স. আদর্শ শেখার একটি প্রতিষ্ঠান বললে বেশি বলা হবে না। এখানে সহীহ-গায়র সহীহ বিচার করার প্রশ্নই আসার কথা নয়।
৫.ওনারা এই বের হওয়াকে “আল্লাহ’র পথে” বের হওয়া বলেন।এভাবে আল্লাহ’র পথে বের হওয়ার যে পদ্ধতি ওনারা অনুসরন করেন(যেমনঃ দুরের মসজিদে ৩/৭/৪০ দিনের চিল্লায় বের হওয়া) এটা কি সহিহ?

-আসলে এটা দাওয়াতের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। এখানে পদ্ধতির চেয়ে ফলাফলের গুরুত্ব বেশি। তবে দূরে কোথাও যাওয়ার পূর্বে অবশ্যই নিজের দায়িত্ব ঠিক ভাবে পালন করে যেতে হবে। এমন যেন না হয় যে পরিবার রইল অভুক্ত, অসহায়, আর আমি চলে গেলাম দূরে কোথাও, চিল্লায়।

৬. ৩/৭/৪০ দিনের চিল্লার ভিত্তি কি?আমার মনে হয় একটা হাদীস আছে যে “যে একাধারে ৪০ দিন তাকবীরে ঊলা’র সাথে জামাতে শরীক হবে,তার অন্তর থেকে আল্লাহ তা’লা মুনাফেকী দূর করে দিবেন বা এ জাতীয় কিছু……”
জ্বি। এ জাতীয় হাদীসগুলোই এর ভিত্তি।
৭.ওনারা বলেন এভাবে আল্লাহ’র পথে বের হয়ে এক রাকাত নামাজ ৪৯ কোটি রাকাত নামাজের সমান যেটা কা’বা শরীফের ১ লাখ রাকাতের চেয়ে অনেক বেশি ছোয়াব/মর্যাদা পুর্ন। তা কি সত্যি? এভাবে আল্লাহ’র পথে বের হয়ে এক টাকা ব্যয় করা সাতশত টাকার সমান ছোয়াব। কোন সহিহ হাদীস কি আছে এ ব্যাপারে?
-নি:সন্দেহে কাবা শরীফে আদায়কৃত নামাযের সওয়াব সবচেয়ে বেশি। তবে কেউ পূর্ণ ইখলাসের সাথে নামায আদায় করলে কবুলিয়্যাতের ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারেন।
৮.আসলে কোন কোন কাজ করলে তাকে আল্লাহ’র রাস্তায় থাকা বলা যায়?উনাদের রাস্তা কি তালিবে ঈ’লমের রাস্তা নাকি আল্লাহ রাসুল (সাঃ) বর্নিত সত্যই আল্লাহ’র রাস্তা যে রাস্তায় থেকে মারা গেলে শহীদের মর্যাদা পাওয়া যাবে।

আল্লাহর কালিমা সমুন্নত হয় এমন যে কোনো পথই আল্লাহর রাস্তা। তা শিক্ষা-দীক্ষা, মসজিদ, শাহাদাত, তাবলীগ যে কোনো পথই হতে পারে। 

৯.আল্লাহ তা’লা বলেছেন সৎ কাজের আদেশ দিতে এবং অসৎ কাজের বাধা প্রদান করতে।কিন্তু “অসৎ কাজের বাধা প্রদানের” ক্ষেত্রে তাবলীগ জামাতের নিশ্চুপ ভাব আমাকে ব্যাথিত করে।(যেমনঃ সাম্প্রতিক সময়ে নারী নীতি,সংবিধানে ইসলাম,বিসমিল্লাহ ইত্যাদি  ব্যাপার)।

-অসৎ কাজ থেকে বাধা দেয়ার বিভিন্ন পর্যায় আছে। রাজনৈতিক কোনো কিছু মোকাবিলা করার জন্য রাজনৈতিক ভাবেই তাতে বাধা দিতে হয়। বর্তমান ইস্যুগুলো পুরোপুরি রাজনৈতিক ইস্যু। এসবে জড়িয়ে তাবলীগ জামাত তাদের বৃহত্তর খিদমতে বাধা ডেকে আনতে চায় না। এ কথা নিশ্চয় জানেন আশা করছি যে, মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু আরব দেশেও বর্তমানে তাবলীগ নিষিদ্ধ। বৃহত্তর স্বার্থে অনেক সময় অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়।

ধন্যবাদ।