আমার ডায়েরি : ২৭/১০/২০১০ : মিথ্যাই যখন সত্য

আমরা সবাই জানি, নবুওয়ত পাওয়ার অনেক আগে, সেই ছেলেবেলা থেকেই আমাদের নবীজী স. আল আমীন বলে পরিচিত ছিলেন। আল-আমীন অর্থ বিশ্বস্ত। সত্যবাদিতা বিশ্বস্ততার অন্যতম পরিপূরক। কাজেই আল-আমীন উপাধির পেছনে তাঁর সত্যবাদিতাও লুকিয়ে ছিল, এতে কোনো সংশয় নেই।

নবীজীর স. পর প্রথম খলিফা আবু বাকার রা. এর উপাধি ছিল সিদ্দিক। সিদ্দিক অর্থ সত্যবাদী।

হাদীসে আছে, আল্লাহর রাসূলের স. কাছে সবচেয়ে অপছন্দীয় চরিত্র ছিল মিথ্যা বলা। (তিরমিযী : ১৯৭৩ : হাসান)

হাদীসে আরো আছে, সত্য মানুষকে ভালো কাজের পথ দেখায়, জান্নাতের পথ দেখায়। মানুষ যখন সত্য বলতে থাকে, তখন আল্লাহর কাছেও তার নাম সিদ্দিক (সত্যবাদী) লেখা হয়। মিথ্যা থেকে বেঁচে থাক। কেননা মিথ্যা মানুষকে খারাপ কাজের পথ দেখায়, জাহান্নামে পৌঁছে দেয়। আর মানুষ যখন মিথ্যা বলতেই থাকে, তখন আল্লাহর কাছের তার নাম কাযযাব (মিথ্যাবাদী) লেখা হয়ে থাকে। (তিরমিযী : ১৯৭১ : সহীহ-আলবানী)

দুই.

আজকাল মোবাইল ফোন হাতে হাতে থাকায় মিথ্যা বলাটা একটা ফ্যাশন হয়ে গেছে। মিথ্যা বলা যে একটা অপরাধ, এবং গুরুতর অপরাধ, সেটা আমরা বেমালুম ভুলে বসেছি।

বাসে প্রায়ই পাশের সিটের লোকদের মোবাইল ফোনে বলতে শুনি, “এই যে স্যার আসছি। হ্যাঁ, হ্যাঁ .. এই তো গুলশানে চলে এসেছি…” অথচ তখনো তিনি বাড্ডায়।

আবার কাউকে বলতে শুনি, “জ্বি ভাই, জ্বি.. এই তো বসুন্ধরা পার করেছি.. আর মাত্র দশ মিনিট লাগবে..” অথচ তখন তিনি নতুন বাজারে।

আমি যা লক্ষ্য করেছি তা হলো, সবাই যে জায়গায় আছেন তার চেয়ে একটু এগিয়ে বলেন। লক্ষ্য করুন, কেউ কিন্তু বলছেন না যে, তিনি গন্তব্যে চলে এসেছেন। গন্তব্যে কেউ পৌঁছান নি, তবে যেখানে আছেন, তার চেয়ে একটু সামনে চলে গিয়েছেন, তা জানাচ্ছেন।

আরেকটু স্পষ্ট করি। ধরুন কেউ রামপুরা থেকে উত্তরা যাবেন। তিনি বসুন্ধরার জ্যামে বসে বলছেন বিশ্বরোড চলে এসেছেন। কিংবা বিশ্বরোডের জ্যামে পড়ে বলছেন খিলক্ষেত চলে এসেছেন।

যিনি বলছেন, বক্তা, তার দৃষ্টিতে লাভ হচ্ছে এটুকু যে, তিনি যেখানে আছেন তার চেয়ে একটু বেশি বলে শ্রোতাকে সাময়িক ভাবে সন্তুষ্ট করছেন। আর যিনি শ্রোতা, তার লাভ হচ্ছে এতটুকু যে, বক্তার বর্তমান অবস্থান শুনে তিনি সাময়িকভাবে পরিতৃপ্ত হচ্ছেন।

ভাবুন তো, স্থায়ী কোনো লাভ কোনো পক্ষের হচ্ছে কিনা? হচ্ছে না। শ্রোতা যতক্ষণ না বক্তাকে গন্তব্যে পৌঁছার কথা বলতে শুনবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তার সন্তুষ্টিটা সাময়িক থাকবে।

তাহলে এটা স্পষ্ট যে, ব্যক্তির এ মিথ্যা দ্বারা পার্থিব কোনো উপকার হচ্ছে না। আর আখিরাতের কোনো উপকারের তো প্রশ্নই উঠে না। বরং সাময়িক এ সন্তুষ্টি অর্জনে আমরা স্থায়ী ভাবে আল্লাহ তা’আলার কাছে নিজেদেরকে মিথ্যাবাদী বলে পরিচয় করাচ্ছি।

যে কাজে পার্থিব কোনো লাভ নেই, আখিরাতে আছে কেবল শাস্তি, সে কাজ করাটা কতটুকু বুদ্ধিমানের পরিচায়ক? আর তা যদি করা হয় প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে, প্রতিটি মোবাইল কলে, তাহলে বুদ্ধির পরিমাণটা গিয়ে কোথায় দাঁড়ায়?

এ হচ্ছে আমাদের বর্তমান ‘বুদ্ধিমান আধুনিক সমাজের’ বুদ্ধির একটা ছোট হিসাব। এভাবে প্রতিনিয়ত আমরা কত যে বুদ্ধিমানের (?) কাজ করছি তার হিসাব নেই।

অবশ্য পাঠক যদি এটুকু পড়ে এবার লেখকের বুদ্ধির হিসাব করতে বসেন, তাহলে তাকে কখনোই নির্বুদ্ধিতা বলব না। বরং লেখকও এখানে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিচ্ছেন বুদ্ধিমানদের বুদ্ধির হিসাব করে, তা ঠিকই টের পাচ্ছি।

ভালো থাকুন।