প্রসঙ্গ বিয়ের বিষয়টা যত সহজ হবে সমাজে, গোনাহের উপকরণ তত কমবে:

সপ্তাহ দুয়েক আগে একটি বিয়ে পড়ানোর সৌভাগ্য হয়েছিল। কনে সদ্য পড়া শেষ করেছেন, বর এখনো পড়ছেন। মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। মালয়েশিয়ায় এখনো কোনো বিয়ে খাওয়ার সুযোগ হয় নি। যে কয়েকবার দাওয়াত এসেছে, ঘটনাক্রমে অন্য কোনো ব্যস্ততা এসে যায়। এই যেমন এ মাসের শেষে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের দাওয়াত, কিন্তু রয়েছি দেশে।

বিয়ে পড়ানোর যিনি অনুরোধ করেন, তিনি জানান যে তিনি কয়েকজনকে অনুরোধ করার পরও তারা না করে দিয়েছেন। আমি শুনে শুনে সাথে সাথেই রাজি হয়ে যাই। বিয়ের বিষয়টা যত সহজ হবে সমাজে, গোনাহের উপকরণ তত কমবে।

যা হোক, জুমার আগে আগে পৌঁছলাম। আগেই জেনেছিলাম যে একটি ঘরে বিয়ে হবে। কল্পনায় ছিল, তাদের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব তো থাকবেই। ঘরে একটি সাজ সাজ ভাব থাকবে – ইত্যাদি।

বাসায় গিয়ে দেখি তাদের কয়েকজন বন্ধু ছাড়া কেউ নেই। চায়নার উইঘুরে তাদের বাড়ি। জন্মগত মুসলিম। বরের বাবা প্রায় দেড় বছর ধরে জেলে। ছয় মাস ধরে কোনো খোঁজ-খবর নেই। কনের পরিবারেরও ওপরও চলছে দুর্যোগ। বস্তুত, সেখানে অধিকাংশ পরিবারেরই প্রধান পুরুষদেরকে ধরে নেয়া হয়, নির্যাতন করা হয়। গত রমজানে বন্দীদের জোর করে রোজা ভাঙানো হয় শুকরের গোশত খাইয়ে। এছাড়া নানা বর্বর নির্যাতন তো রয়েছেই। কিছুদিন আগে জোর করে মহিলাদের কাপড় ছোট করার খবর এসেছে।

বর জানান, এর চেয়ে অনেক বর্বর নির্যাতন চলে, খবরে আসে না। তিনি জানান, দেশে আর তার ফেরা হবে না। বরং তাদেরকে পরদেশেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়। স্পাই রয়েছে জায়গায় জায়গায়। তাদের সুখে কষ্ট পেতে হয় বাড়িতে পরিবারকে।

তাদের সরকার তাদের বিয়ে রেজিস্ট্রি করবে না। এই পরদেশে রেজিস্ট্রি করতে হলে তাদের এমবাসির চিঠি লাগবে, যা তারা পাবে না। বিয়ে পড়ানোর আগে বর-কনেকে তাই পরিষ্কার বলে নিলাম, রেজিস্ট্রি ছাড়া বিয়ের ভালো-মন্দ। জানালাম, দিন শেষে তাদের দুজনের বন্ধনই মূল। রেজিস্ট্রিসহ অনেক বিয়ে আছে, টিকে নি। আবার রেজিস্ট্রি ছাড়া অনেক বিয়ে আছে, দিব্যি টিকে আছে।

তারা জানালো, তারা উভয়ই বিষয়টি ভালোভাবে জানেন। আপ্লুত হলাম। মোহর নির্দিষ্ট করা হলো। খুতবা, খিতবাহ, ইজাব-কবুল হলো। বাঙালী বন্ধুরা কিছু খাবার কিনে এনেছিলেন, খেয়ে নিলাম। এক বুক হতাশার সাথে দুয়া করে বিদায় নিলাম। অবশ্য এমন বিয়েতে থাকতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবানও মনে হলো, আলহামদুলিল্লাহ।

===

ঘটনাটা এরপর থেকে আমাকে বেশ ভাবাচ্ছে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে চিন্তা করলে আমরা প্রায় সবাই জন্মগত মুসলিম। আযানের শব্দ শুনে বড় হয়েছি। ফজরের পর কুরআনের মধুর ধ্বনি আমাদের কানে বেজেছে। হিন্দু-মুসলিমের অহিংস সহাবস্থান এখানে বহু দিনের।

অথচ আমরা কতটা হতাশ ও অস্থির! রাস্তায় বের হলেই কিছু হলেই শুনতে পাই “পিডা … ভাইঙ্গা লা…”। সাথে কোথাও গাড়ির কাচ ভাঙার শব্দ, তো কোথাও কোনো মানুষকে প্রহার করার। এখানে একে অপরকে আঘাত করে, অপদস্থ করে আমরা আনন্দ পাই। আমরা নিজেরাই একে অপরের শত্রু।

আমরা কি হতে পারি না শান্তির পতাকাবাহী? আমাদের আশ-পাশের মানুষদেরকে কি কেবল ‘মানুষ’ হিসেবে সম্মান করতে পারি না আমরা? আসুন আমরা ভালবাসার কথা বলি, ভালো আচরণ করি। সমাজে ইতিবাচকতা ছড়িয়ে দেই। কাউকে আঘাত করার মাঝে জয় নেই, আছে পরাজয়, ব্যক্তিত্বের পরাজয়, নিজের কাছে, নিজের বিবেকের কাছে।

#ইতিবাচক_বাংলাদেশ