প্রসঙ্গ ব্যক্তিগতভাবে নিজেদের ড্যাটা প্রাইভেসি বা তথ্যের গোপনীয়তা সংরক্ষণে সচেতনতা সৃষ্টি:

কিছুদিন আগে বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য টেকনোলজি কোম্পানির মোবাইল এপ্লিকেশনে ড্যাটা প্রাইভেসি (তথ্য গোপনীয়তা) লঙ্ঘনের প্রমাণ চোখে পড়ল, এবং এ নিয়ে পরিচিতদের মধ্যে বেশ উৎকণ্ঠা লক্ষ্য করলাম। সাধারণত এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা কম হয়। হয়ত কখনো বিষয়গুলো সামনে আসলে আমরা সচেতন হই, প্রতিক্রিয়া দেখাই।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা বর্তমানে ড্যাটা প্রাইভেসির সবচেয়ে নিকৃষ্ট সময়ে বসবাস করছি। একদিকে নিজেরা জেনে-বুঝেই অনেক ড্যাটা পাবলিক করে দিচ্ছি। যেমন, কী পছন্দ করি, কী খাই, কোথায় যাই, কাদের বন্ধু বানাই, ছেলে-মেয়ের নাম কী, বয়স কত, কোন স্কুলে পড়ে ইত্যাদি সোশাল মিডিয়ায় সবাইকে জানিয়ে বেড়াচ্ছি। কখনো বা বোর্ডিং পাসের বারকোডের ছবি, বা টিকিটের, কখনো বা পাসপোর্টের ছবি প্রকাশ করছি।

কখনো আবার আমাদের অজান্তে বিভিন্ন কোম্পানি বিভিন্ন ড্যাটা হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রতিটি ওয়েবসাইট বিভিন্ন ট্র্যাকিং কোড ব্যবহার করছে, যা আমাদের ওয়েব ও সোশাল মিডিয়ার নানা ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট (পদচিহ্ন) রেখে দিচ্ছে। যে ওয়েবসাইটে একটু আগে ভিজিট করেছি, গুগল-ফেইসবুক সে ওয়েবসাইটের প্রোডাক্টের অ্যাড দেখাবে, ইউটিউব তার ভিডিও অ্যাড দেখাবে – ইত্যাদি।

মোবাইল অ্যাপ, বিভিন্ন ব্যান্ড – এগুলো তো আরো একধাপ এগিয়ে। ক্ষেত্রভেদে ডিভাইসের ফাইল-ফোল্ডার থেকে শুরু করে মাইক, ক্যামেরা, কন্টাক্ট লিস্ট, এসএমএস, বিভিন্ন সেন্সর ইত্যাদি যাবতীয় অনুমতি এক ক্লিকে নিয়ে নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই এরপর এগুলোর ব্যবহার তারা কীভাবে করবে, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট না। হুসনে জন – বা সুধারণার ভিত্তিতে আমরা সেসবের অনুমতি দিয়ে দিচ্ছি।

বিগ ড্যাটা (ডিজিটাল তথ্যের বিশাল সংগ্রহ) এনালিসিস বর্তমানে একটি বড় স্কিল, এবং এর প্রচুর চাহিদা। ড্যাটা ম্যানেজমেন্টের বিভিন্ন টুল ও সমাধান নিয়ে প্রতিযোগিতায় আছে গুগল, এমাজন, আইবিএম, মাইক্রোসফট, আলিবাবার মতো কোম্পানিগুলো।

ড্যাটা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার পর আসে এর ব্যবহার। নানাভাবেই এর ব্যবহার সম্ভব। ভালো, কিংবা খারাপ। ব্যবসায়িক প্রচারণার জন্য ড্যাটাকে যেমন ভালোভাবে ব্যবহার করা যায়, তেমনি তা তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রয় করে, শেয়ার করে বা অন্য নানা ভাবে তা অসদুপায়ে ব্যবহার করা সম্ভব। কিছুদিন আগে পাকিস্তানের একটি ব্যাংকের হাজারো গ্রাহকের ক্রেডিট কার্ডের ড্যাটা কালো বাজারে বিক্রয় করা হয়েছে।

এত কিছু বলার উদ্দেশ্য হলো, কারো ড্যাটা বা তথ্য ইসলামে অনেক মূল্যবান বিষয়। এটা যত্রতত্র সংগ্রহ করা বা যেনতেনভাবে ব্যবহারের বিষয় নয়।

রাসূল স. বলেন:

“হে ঐ জামাআত, যারা মুখে ইসলাম কবুল করেছ কিন্তু অন্তরে এখনো ঈমান মজবুত হয়নি। তোমরা মুসলমানদের কষ্ট দিবে না, তাদের লজ্জা দিবে না এবং তাদের গোপন দোষ অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হবে না। কেননা, যে লোক তার মুসলিম ভাইয়ের গোপন দোষ অনুসন্ধানে নিয়োজিত হবে আল্লাহ তা’আলা তার গোপন দোষ প্রকাশ করে দিবেন। আর যে ব্যক্তির দোষ আল্লাহ তা’আলা প্রকাশ করে দিবেন তাকে অপমান করে ছাড়বেন, সে তার উটের হাওদার ভিতরে অবস্থান করে থাকলেও।” (তিরমিযী: ২০৩২)

আল্লাহ তায়ালা বলেন (অনুবাদ):

“ওহে যারা ঈমান এনেছ! অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্দেহ এড়িয়ে চল, কেননা কোনো কোনো সন্দেহ নিশ্চয়ই পাপজনক। আর তোমরা গুপ্তচরবৃত্তি করো না, আর তোমাদের কেউ-কেউ অন্যদের আড়ালে নিন্দা করো না। তোমাদের কেউ কি চায় যে সে তার মৃত ভাইয়ের মাংস খাবে? নিশ্চিত তোমরা এটি ঘৃণা কর। আর আল্লাহ্‌কে ভয়-ভক্তি করো। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্‌ বারবার প্রত্যাবর্তনকারী, অফুরন্ত ফলদাতা। (আল-কুরআন, ৪৯:১২)”

এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ‘তাজাসসুস’ করতে নিষেধ করেছেন। মুফাসসিরগণ এর ব্যাখ্যা করেছেন, কারো গোপন তথ্য অনুসন্ধান করা, যা প্রকাশ করা হয় নি। যদিও তাঁরা গোপন দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করার কথা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু আয়াতে উল্লিখিত শব্দটি ব্যাপক। তাছাড়া দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধানে যেমন মানুষের ক্ষতি করা সম্ভব, আমরা যে ড্যাটার গোপনীয়তা নিয়ে কথা বলছি, তা প্রকাশ হলেও নানাবিধ ক্ষতি করা সম্ভব।

ব্যাংক-কার্ডের ড্যাটা চুরি হলে আর্থিক ক্ষতি করা সম্ভব, চিকিৎসা বা হেলথ ড্যাটা চুরি হলে বিবাহ-সম্পর্ক সহ নানাভাবে ক্ষতি করা সম্ভব। পাসপোর্ট নম্বর, ভোটার আইডি ইত্যাদি মানুষের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় বহন করে, যা প্রকাশ হলে নানাবিধ ক্ষতি করা সম্ভব।

তাছাড়া এসব তথ্য ব্যক্তির আইডেন্টিটি বা পরিচয়কে উন্মুক্ত করে দেয়, তাকে পণ্য বানিয়ে দেয়। মানুষ অত্যন্ত সম্মানিত, তার ব্যক্তিসত্তা বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন কোনো পণ্য হতে পারে না, ঠিক তেমনটি তার পরিচয়ও কোনো পণ্য হতে পারে না।

একই সাথে বিষয়টি আমানতের মারাত্মক খেয়ানত, অন্য শব্দে বললে, বিশ্বাসঘাতকতা ও মুনাফিকী। সবশেষে এটি নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে আধুনিক রাষ্ট্রে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এই পোস্টের উদ্দেশ্য দুটো। এক: ব্যক্তিগতভাবে আমাদের নিজেদের ড্যাটা প্রাইভেসি বা তথ্যের গোপনীয়তা সংরক্ষণে সচেতনতা সৃষ্টি করা। দুই: আমাদের প্রত্যেকে এবং বিশেষ করে ব্যবসায়ী ভাই-বোনদের ড্যাটা প্রাইভেসি লঙ্ঘনের ভয়াবহতা সম্পর্কে সজাগ করা।

আধুনিক এ ডিজিটাল পৃথিবীতে আমরা যেন আমাদের আমানাহ নষ্ট না করি। আল্লাহ তাওফীক দিন। আমীন।