আমার ডায়েরি ০৭/০৭/২০১০ | প্রসঙ্গ : জুমার বয়ানের বিষয় নিয়ন্ত্রণ

সপ্তাহখানেক আগে ফেসবুকে কে যেন ‘বাবা আলীর’ একটা ভিডিও শেয়ার করেছিলেন। বিষয় ছিল ‘জুমার খুৎবা’। বাবা আলীকে যারা চিনেন না তাদের জন্য সংক্ষেপে বলি, বাবা আলী একজন নও মুসলিম। ‘বাবা আলী’ তার ছদ্মনাম। ইউটিউব ও অনলাইন ভিডিও শেয়ারিং সাইটগুলোতে প্রায়ই তিনি নিজের ধারণকৃত ভিডিও শেয়ার করে থাকেন। ইসলামের অনেক যুগোপযোগী বিষয়কে হাস্য রসাত্মক উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে তিনি ভিজিটরদের চেতনায় শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। গুগল ভাইয়াকে জিজ্ঞাসা করলেই তার সম্পর্কে আরো বিস্তারিত পেয়ে যাবেন।

তো বলছিলাম সেই ভিডিওর কথা। সেই ভিডিওতে তিনি নানা অভিনয়ের মধ্য দিয়ে যা তুলে ধরেছেন তার সারমর্ম হলো, আমাদের সমাজের খতীবরা বছরের পর বছর একই টপিকের উপর বয়ান করে যান। সেই নামায, রোজা, ওযু, যাকাত, হজ্জ্ব, দান-সদকা, কুরবানী। সেই একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে যান সবসময়। অথচ আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয় যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক সম্পর্ক ইত্যাদি নিয়ে তারা কিছু বলেন না। ফলে আমরা জুমার দিন মসজিদে যাই ঠিকই, কিন্তু পরস্পরিক কুশল বিনিময়, আড্ডাবাজি আর মৃদু ঘুম দিয়ে সময় কেটে যায়। হঠাৎ হঠাৎ হয়ত সুবহানাল্লাহ-আলহামদুলিল্লাহ বলার জন্য জেগে উঠি।

তার বক্তব্যের মূল ম্যাসেজ হলো, আমাদের খতীবদের উচিৎ সমাজের চাহিদা বুঝে, মানুষের আগ্রহ বুঝে নিত্য নতুন বিষয়ের উপর জুমার বয়ান প্রদান করা। তাতে মানুষের আগ্রহও বাড়বে, নতুন কিছু শিখতেও পারবে এবং জুমার বয়ানের যথার্থতাও প্রকাশ পাবে।

আসলে এই অভাবটা শুধু তিনিই নন, আজ সমগ্র মুসলিম বিশ্বই উপলব্ধি করছে। একসময় আরব আমিরাতের ‘আওকাফ‘ এর ওয়েবসাইট থেকে নিয়মিত জুমার খুৎবা সংগ্রহ করতাম। যেদিন বুঝতে পারলাম যে আওকাফ একই খুৎবা বছর ঘুরে উপস্থাপন করে, সেদিন থেকে ওয়েবসাইটটি ভিজিট করা ছেড়ে দিলাম। আশ্চর্য! তিন বছর ধরে ঈদের খুৎবা একই রকম। প্রতি মাসের ১ম, ২য়, ৩য়, ৪র্থ সপ্তাহগুলোর খুৎবা ঘুরে ফিরে আগের বছরের মতোই।

জুমার খুৎবা কেন শরীয়তে নির্দেশিত হয়েছে? এ প্রশ্নের জবাবে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। কিন্তু কমন যে কথাটি সবাই বলেছেন, তা হলো, সপ্তাহের একটি দিন মানুষকে সারা সপ্তাহের জন্য সতর্ক করে দেয়া। বা এই একটি দিনকে সাপ্তাহিক ক্লাস ধরে নেয়া। যে ক্লাসে সবাই ইসলামের নতুন কিছু শিখবে।

কিন্তু ঘুরে ফিরে যদি একই কথা প্রতি বছর শোনানো হয়, তাহলে নতুন কিছু শেখা হবে কীভাবে? আর এর প্রতি মানুষের আগ্রহই বা ধরে রাখা যাবে কীভাবে? এজন্যই তো এখন জুমার দিন মুসল্লী আসে ঠিক নামাযের আগে। কারণ এর আগে কী বলা হবে তারা যেন তা আগে থেকেই জানেন।

তবে দোষটা কি শুধুই খতীব সাহেবদের? তারা অজ্ঞ, পিছিয়ে, নয়তো সমাজের চাহিদা বুঝতে অক্ষম? এসব শব্দ কি আদৌ খতীব সাহেবদের জন্য মানায়? যারা খতীব হন, তাদের কি এতটুকু যোগ্যতা থাকে না, যে সমাজে কখন কী বললে মানুষের উপকার বেশি হবে তারা তা বুঝেন না?

এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা খোঁজার চেষ্টা করি না। তাই তো ‘বাবা আলী’রা এরকম ভিডিও প্রকাশ করে একচেটিয়াভাবে খতীবদেরকে হাসির পাত্র বানাতে পারেন। আফসোস!

আমাদের একটা কথা কখনোই মাথায় আসে না যে, আমাদের খতীবদেরকে আমরা একজন নগন্য কর্মচারীর চেয়েও নগন্য মনে করি। এপয়েন্টমেন্টের পর থেকে প্রতিটা ক্ষণ তাদেরকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করি। পারলে তিনি কবে কী বিষয় নিয়ে বলবেন তাও ঠিক করে দিই।

খতীব সাহেব সুদ নিয়ে বললেন, পরদিন তাকে সতর্ক করে দিই। কারণ আমি নিজেও সুদী কারবারে যুক্ত। খতীব সাহেব ঘুষের বিরুদ্ধে বলছেন, সাথে সাথে তার কণ্ঠরোধ করি। কারণ ঘুষ না হলে যে আমার পরিবার চলেই না। খতীব সাহেব হালাল-হারামের কথা বলছেন, তাকে আঙ্গুল তুলে সতর্ক করে দিই। কারণ হারাম বেছে খাওয়া আমার জন্য কখনোই সম্ভব না।

খতীব সাহেব পোষাক-আষাক নিয়ে বললেন, তাকে নিন্দা জানাই। কারণ, আমার ছেলে মেয়েই যে হরহামেশা ফ্যাশন নিয়ে পড়ে থাকে। খতীব সাহেব পর্দা নিয়ে বললেন, পরদিন তাকে এ বিষয়ে কথা না বলার অনুরোধ করি। কারণ তাতে আমার সস্ত্রীক সেজে গুজে পার্টিতে যাওয়া বন্ধ করতে হয়। খতীব সাহেব প্রতিবেশীর হক নিয়ে বলছেন, তাও তার পেছনে পড়ি। কারণ আমি প্রতিবেশীকে দু’চোখে দেখতে পারি না।

আচ্ছা, এসব বিষয় বাদ দিলে খতীব সাহেবের জন্য আর কী কী বিষয় বাকী থাকে? সুন্নত-বিদাত, সীরাত-মিলাদ ইত্যাদি, তাইতো? তাতেও সমস্যা। বছর বছর ধরে নানা রুসম রেওয়াজ ধর্মের নামে পালন করে আসছি। এখন এগুলোকে বিদাত বললে যে বাবা-মার প্রতি অসম্মান হয়। বাবা-মাকে ছোট থেকে এসব পালন করতে দেখে এসেছি। তাই খতীব সাহেবকে আবারও সতর্কবার্তা পৌঁছে দিই।

কাজেই খতীব সাহেব বেচারা আর কোনো গত্যান্তর না পেয়ে ফিৎনা এড়াতে কেবল অযু, গোসল, নামায, রোজা, হজ্জ, যাকাত, কুরবানী আর দান-সদকার বয়ান নিয়ে পড়ে থাকেন। খতীব সাহেবেরই বা কী দোষ, তাকেও তো চাকুরী বাঁচাতে হবে। সে চলে গেলে অন্য কেউ তার স্থানে এসে তো ঠিকই মানুষের ফরমায়েশ মেনে চলবে। কাজেই সব ভেবে খতীব সাহেবের আর কি-ই-বা করার থাকে?

‘বাবা আলী’ দের প্রতি তাই সবিনয়ে অনুরোধ, শুধু খতীবদেরকেই নয়, আসুন খতীবদের নিয়ন্ত্রণকারীদের সচেতন করার জন্য এগিয়ে আসি। আসুন তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি, একজন খতীব সমাজের ধর্মীয় নেতা। ধর্মের ব্যাপারে তাকে স্বাধীন ভাবে বলতে না দিলে, তার কণ্ঠ চেপে ধরলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।