আমার ডায়েরি : ৩১/০৩/২০১১ : আমরা দিন দিন হৃদয়হীন নিষ্ঠুর পাথরে পরিণত হচ্ছি

ঘটনা ১ : রিকশায় করে জামিয়াতুল আস’আদ আল ইসলামিয়ায় যাচ্ছি। আমাকে বহন করা রিকশাটিকে পাশে থেকে একটি ভ্যান লাগিয়ে দিল। রিকশাচালক ভ্যানচালককে বলল, ‘বায়ে চাপতে পারলেন না’? ব্যাস। ভ্যানের পেছনে থাকা লোকটি এসে আমি বসা অবস্থায়ই রিকশাচালককে একটা লাথি মেরে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ভ্যানের সামনের লোকটি এসে রিকশাচালককে আরেকটি লাথি মারল। আমি সিটে বসে এই যে থামানোর চেষ্টা করছি, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। লোকজন জড়ো হলো।

ভ্যানের লোক দুটো সবার চাপে পিছু হটল। ঘটনা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু হলো না। রিকশাচালক আমাকে রেখে তেড়ে গেল তাদের দিকে। ঘুষাঘুষি শুরু হয়ে গেল। এবার জোর করেই আমি ঘটনার ভেতরে ঢুকে পড়লাম। রিকশাচালকর হাত জোর করে চেপে ধরে টেনে আনলাম। আর লোকজনে ভ্যানচালকদের ঠেকালো। ঘটনা বাধ্য হয়ে শেষ হলো।

ঘটনা ২ : আমাদের বাসার পেছনে একটা বড় ডোবা। ডোবার পাশে আঁকাবাঁকা একটি পথ। খুব কম মানুষই হাঁটে এই পথ দিয়ে। এলাকার আড্ডাবাজ ছেলেদেরকে অনেক সময় এ পথে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে দেখা যায়। সচরাচর মানুষের আনাগোনা নেই, তাই অনেকের কাছে নিরাপদ পথ এটি। রিকশা কখনো চলতে দেখি নি, চলা সম্ভব নয় বলেই জানতাম।

হঠাৎ গত সন্ধ্যায় এই পথে একজনের চিৎকার শুনলাম। জানালা দিয়ে তাকিয়ে ভালো করে শোনার চেষ্টা করলাম। শুনলাম, ‘ভাই, আমার রিকশায় করে কে এসেছেন? ভাড়া দেন।’ খুব চিৎকার করে বলছে এক ব্যক্তি। একবার, দু’বার নয়। প্রায় ১০ মিনিট ধরে এভাবে শুনছি তাকে। আমি বারান্দায় এসে তাকে ডাকলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, কী হয়েছে ভাই?

তিনি বললেন, দুই জন লোককে তিনি ঘন্টা হিসেবে দুপুর দুইটার সময় রিকশায় উঠিয়েছেন। (আমি যখন জিজ্ঞাসা করছি, তখন রাত সাড়ে নয়টা।) তারা গুলশান সহ অনেক জায়গায় ঘুরেছে। ভাড়া এসেছে ৫০০ টাকা। এই গলির মুখে রিকশা এনে তারা নেমেছে। বলেছে, চাচা আমরা ভাড়াটা পাঠিয়ে দিচ্ছি। এরপর গায়েব। আর আসে নি। এখন তিনি দিশেহারা।

আমি বললাম, চাচা, এই গলিতে তো লোকজন তেমন চলাচল করে না। ওরা নিশ্চয় আপনাকে রেখে চলে গিয়েছে।

লোকটা আমার কথা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। আবারো চিৎকার শুরু করলেন, ‘ভাই, আমার রিকশায় করে কে এসেছেন? ভাড়া দেন।’ এলাকার আরো কিছু লোক বের হয়ে আসল। বলাবলি করল, কেমন লোক, ৫০০ টাকা না হয় ৫০ টাকাও তো দিতে পারত..

ওদিকে তার সে কী কান্না..

জানি না কেন, আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। কল্পনা করছিলাম, দুপুর দুইটা থেকে নিশ্চয় তিনি কিছু খাননি। যখন তাদের নামিয়ে দিচ্ছেন, তখনো কল্পনা করছিলেন, আজ জমাটা ঠিক মতো দিয়ে বাড়িতে বাজার নিয়ে যেতে পারব। বাচ্চাগুলোর খরচ দেয়া যাবে। ইত্যাদি কত কিছু…

কিন্তু ওই নিষ্ঠুর লোক দুটো তাকে ঠকিয়ে চলে গেল।

লোকটা কাঁদছেই.. খুব জোরে..

আমি আবার বারান্দায় দাঁড়ালাম। বললাম, চাচা, বাসার সামনের দিক দিয়ে একটু আসেন। তিনি আসলেন। চোখ মুছতে মুছতে। খুব বয়স্ক। দেখে মায়া আরো বেড়ে গেল। আমি হাতে ‘তিন শত’ টাকা দিলাম। বললাম, ভবিষ্যতে এভাবে কাউকে ভাড়া ছাড়া যেতে দিবেন না। ভাড়া আদায় করে তবেই যেতে দিবেন। দোয়া করবেন আমাদের জন্য।

লোকটা কেঁদে দিল। দোয়া করল।

আমার কষ্টটা হালকা হলো। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলাম, যিনি তাকে সাহায্য করার তাওফীক দিলেন।

রাসূল স. বলেছেন, একাধিক সূত্রে আছে,

اطيب الكسب كسب اليد

সবচেয়ে পবিত্র আয় হলো হাতের আয়।

অর্থাৎ কায়িক পরিশ্রমের আয় সবচেয়ে হালাল ও পবিত্র। এ জন্যই আল্লাহ তা’আলা সব নবী-রাসূলকেই হাতের আয় দিয়ে জীবন শুরু করিয়েছেন। মেষ চড়ানো, লোহার বস্তু বানানো, কাঠ মিস্ত্রীর কাজ করা.. ইত্যাদি নানা রকম হাতের কাজ দিয়ে তাদের আয়কে পবিত্র বানিয়েছেন।

এই রিকশাচালকদের দেখলে হাদীসটির কথা মনে পড়ে যায়। নি:সন্দেহে তাদের আয় সবচেয়ে হালাল। তাদের ভেতর দূর্নীতি নেই, বাটপারি নেই।

তাদেরও যদি কেউ ঠকায়, কাঁদায়, তাহলে তার পরকাল নিয়ে সন্দেহ পোষণ করতেই হয়।

আল্লাহ আমাদের হালাল আয় করার তাওফীক দিন এবং মানুষকে শ্রদ্ধা করার ও ভালবাসার তাওফীক দিন। আমীন।