প্রশ্ন : যারা ইসলাম গ্রহণ করেন নি, কিন্তু অনেক ভালো কাজ করেছেন, কিংবা যাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে নি, তাদের পরিণাম কী হবে?

প্রশ্ন : আসসালামু আলাইকুম

জনাব,

আপনার এই সাইটে প্রদর্শিত বিভিন্ন প্রশ্ন আর তার জবাব পড়ে আমি সত্যিকার অর্থেই মুগ্ধ হয়েছি। আমার একটি প্রশ্ন রয়েছে আপনার কাছে। উত্তর পেলে কৃতার্থ হব। আমার প্রশ্নটি নিম্নরূপঃ

আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন মানব জাতিকে সৃষ্টি করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। তারা বিভিন্ন ধর্ম এবং জাতিতে বিভক্ত। সকলেই মুসলমান নয়। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান এবং ইহুদী ছাড়াও পৃথিবীতে আরো বিভিন্ন ধর্মের মানুষ রয়েছে। তাদের গৃহে যে শিশুর জন্ম হয়, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে সে আল্লাহ্‌ ও ইসলামের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পায়না। অনেক মহান ব্যক্তি আছেন যারা মুসলমান নন, কিন্তু জীবনের সকল কর্ম মানুষের কল্যাণার্থে সম্পন্ন করেছেন। এই শ্রেণীর মানুষেরা পরকালে কি কোন প্রতিদান পাবেন?

পৃথিবীতে এমন অনেক জাতি আছে যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানব সভ্যতার থেকে অনেক দূরে বসবাস করে। তারা নানা প্রকার দেবদেবীতে বিশ্বাস নিয়ে চলে। তাদের ক্ষেত্রে কি হবে? তারাতো আল্লাহ্‌ ও ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানে না। পরকালে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ্‌ কি ফয়সালা করবেন সে সম্পর্কে আলেমগণ কিছু বলেছেন কি?

যদিও আল্লাহ্‌ বলেছেন যে, প্রত্যেক জাতির জন্যই তিনি নবী অথবা রাসূল পাঠিয়েছেন, কিন্তু শেষ নবী হযরত মুহম্মদ (সঃ) আগমনের পরে প্রায় দেড় হাজার বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। এর মাঝে এ সকল অবিশ্বাসীদের প্রতি কোন নবী প্রেরীত হননি। সুতরাং তারা কোথায় যাবে?

খৃষ্টান সম্প্রদায়ের ভিতরে যদি এমন কেউ থাকে যে ‘ত্রিত্ববাদ’ এ বিশ্বাস করে না কিন্তু হযরত ঈসার (আঃ) এর পদাঙ্ক অনুসরন করে চলে তার ক্ষেত্রে ফয়সালা কি? কোন একজন ইহুদীর ক্ষেত্রেই বা ফয়সালা কি হবে যদি সে কাজে কর্মে সৎ হয়? অনেক মহান ব্যক্তি যাঁরা অমুসলিম কিন্তু কর্মে সৎ তাদের ক্ষেত্রে কি হবে সে সম্পর্কে যদি কুরআন ও হাদিস মোতাবেক কিছু সমাধান দেন তাহলে উপকৃত হব।

আল্লাহ্‌ আপনার মঙ্গল করুন। আমীন।

উত্তর :

ওয়ালাইকুম আসসালাম।

এরকম প্রশ্ন অনেকেই ভেতরে চেপে রাখেন। বছরের পর বছর। এক সময় এসব প্রশ্ন বড় হয়ে মনে নাস্তিকতাকে উস্কে দেয়। তাই প্রশ্ন ছোট থাকতেই উত্তর অন্বেষণ করা বুদ্ধিমানের কাজ। আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন। ধন্যবাদ আপনাক।

আপনি তিনটি প্রশ্ন করেছেন।

১. যেসব হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, ইহুদী ইসলামের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায় না, অথচ তারা পৃথিবীতে অনেক ভালো কাজ করে যান, তাদের ব্যাপারে ইসলাম কী বলে?

২. যেসব এলাকায় ইসলামের বাণী পৌঁছে নি, তাদের কী বিধান।

৩. যেসব খৃষ্টান এক আল্লাহ ও ইসা আ. এর ওপর বিশ্বাস রাখেন, তাদের কী হবে?

আমাদের উত্তরের সারাংশ :

১. তারা পার্থিব প্রতিদান পাবে, পরলৌকিক প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হবে।

২. তাদেরকে আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন পরীক্ষা করবেন। তারা উত্তীর্ণ হলে জান্নাতে যাবে, না হলে জাহান্নামে যাবে।

৩. মুহাম্মাদ স. এর আগমনের পর একমাত্র তাঁর প্রতি বিশ্বাসই মানুষকে মুক্তি দিবে। কাজেই অন্য কারো প্রতি বিশ্বাস থাকাটা যথেষ্ট হবে না।

এবার বিস্তারিত :

ভূমিকা :

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রতিটি মানুষকে একটি কমন সেন্স দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। যে সেন্স তাকে এমনিতেই স্রষ্টা যে একজন আছেন এবং তিনিই তাকে সৃষ্টি করেছেন, বুঝতে সাহায্য করবে। পরে এই বুঝের ওপর নির্ভর করে সে সত্য ধর্ম সম্পর্কে অনুসন্ধান করবে। এবং এক পর্যায়ে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করবে।

এই কমনসেন্সই আল্লাহর বাণীতে উল্লিখিত ‘ফিতরাত’। তিনি বলেন,

فطرة الله التي فطر الناس عليها

এ হচ্ছে ফিতরাত, যার ওপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।

হাদীসে আছে, রাসূল স. বলেছেন,

كل مولود على الفطرة – فابواه يهودانه أو يمجسانه أو ينصرانه

অর্থাত, আল্লাহ সব নবজাতককে ফিতরাতের ওপর সৃষ্টি করেন। পরে তার পিতা-মাতা, পরিবেশ তাকে ইহুদী, খৃষ্টান বা অগ্নিপূজক বানায়।

এ হাদীসে রাসূল স. আরো বলেন, তোমরা তো বিভিন্ন পশু দেখেছ। কোনো পশু কি শরীরে চিহ্ন নিয়ে জন্মায়? না। বরং, তাকে পরে চিহ্নিত করা হয়।

দুই.

আল্লাহ তা’আলা যুগে যুগে অনেক নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। যে যুগে যাঁকে পাঠিয়েছেন, সে যুগে তাঁর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করাই ছিল সঠিক পথ। সর্বশেষ তিনি মুহাম্মদ স. কে পাঠান। এরপর একমাত্র তাঁর পথই সঠিক পথ। অন্য সব পথ ভ্রান্ত ও বাতিল।

আল্লাহ বলেন,

“ومن يبتغ غير الإسلام ديناً فلن يقبل منه وهو في الآخرة من الخاسرين”

ইসলাম ছাড়া যে অন্য কোনো দ্বীন অন্বেষণ করে, তিনি তা তার কাছ থেকে কখনো কবুল করবেন না। এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

বরং, পূর্বের কোনো ধর্মের অনুসারী যখন ইসলামের আগমনের পর ইসলামের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে, তার জন্য বেশি সওয়াবের ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ বলেন,

( إِنَّ الَّذِينَ ءَامَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالنَّصَارَى وَالصَّابِئِينَ مَنْ ءَامَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلا هُمْ يَحْزَنُونَ(62) سورة البقرة

যারা ঈমান এনেছে, এবং ইহুদী, খৃষ্টান ও সাবীদের মধ্য থেকে যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছে, আবার সৎ কর্মও করেছেন, তাদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে প্রতিদান। দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের কোনো ভয় ও চিন্তা নেই। (২:৬২)

ইহুদী, খৃষ্টান যারা রাসূল স. এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনি তাদের সম্পর্কে মহানবী স. বলেন,

((والذي نفسي بيده لا يسمع بي أحد من هذه الأمة: يهودي ولا نصراني، ثم يموت ولم يؤمن بالذي أرسلت به إلا كان من أهل النار))

সেই মহান সত্ত্বার শপথ যার কবযায় আমার প্রাণ, এই উম্মতের কোনো ইহুদী, খৃষ্টান যদি আমার কথা শুনে, এরপর আমার আনীত বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের আগেই মারা যায়, তাহলে সে জাহান্নামবাসী হবে। (মুসলিম)

অপর হাদীসে তিনি বলেন,

((كل أمتي يدخلون الجنة إلا من أبى؟ قيل يا رسول الله من يأبى؟ قال: من أطاعني دخل الجنة ومن عصاني دخل النار))

আমার উম্মতের সবাই জান্নাতে যাবে, তবে যে অস্বীকৃতি জানায় সে ছাড়া। বলা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ, অস্বীকৃতি জানায় কে? তিনি বললেন, যে আমার অনুসরণ করবে সে জান্নাতে যাবে। আর যে আমার আমার অনুসরণ করবে না, সে জাহান্নামে যাবে। (বুখারী)

বস্তুত আল্লাহ কারো ওপর জুলুম বা অবিচার করেন না। মানুষ নিজেই নিজের ওপর অবিচার করে। আল্লাহ বলেন,

إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ النَّاسَ شَيْئًا وَلَكِنَّ النَّاسَ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ

আল্লাহ মানুষের ওপর একটুও অবিচার করে না। মানুষ নিজেই নিজের ওপর অবিচার করে। (১০:৪৪)

অপর এক আয়াতে তিনি বলেন,

إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ وَإِنْ تَكُ حَسَنَةً يُضَاعِفْهَا وَيُؤْتِ مِنْ لَدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًا

আল্লাহ অনু পরিমাণও কারো ওপর জুলুম করেন না। যদি একটি সৎ কাজ কেউ করে, তাহলে তিনি তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। এবং নিজ থেকে তাকে বড় প্রতিদান দেন। (৪:৪০)

তিন.

এবার আসুন আপনার প্রশ্নগুলো আলোচনা করি।

প্রশ্ন : ১ : যেসব হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, ইহুদী ইসলামের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায় না, অথচ তারা পৃথিবীতে অনেক ভালো কাজ করে যান, তাদের ব্যাপারে ইসলাম কী বলে?

উত্তর : যেহেতু আল্লাহ প্রদত্ত কমন সেন্স তাদের ছিল এবং ইসলাম সম্পর্কে জানার যথেষ্ট উপকরণ তারা পেয়েছিলেন, এরপরও তারা ইসলাম গ্রহণ করেন নি, তাই তারা জান্নাতে যেতে পারবেন না। তবে হ্যাঁ, আল্লাহ কারো ওপর জুলুম করেন না। তারা যা ভালো কাজ করেছেন, এর প্রতিদান পৃথিবীতে তাদের দিয়েছেন। মানুষ তাদেরকে চিনেছে, জেনেছে। তাদের মৃত্যুর পরও তাদের সুনাম পৃথিবীর মানুষ করেছে। তাদের ভালো কাজের পার্থিব প্রতিদান আল্লাহ এভাবে দিয়েছেন।

কিন্তু পরলৌকিক প্রতিদানের জন্য যেহেতু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর বিশ্বাস স্থাপনটা মূল রিকোয়েরমেন্ট, যা তাদের বেলায় অনুপস্থিত, তাই তারা পরলৌকিক কোন প্রতিদান পাবেন না।

প্রশ্ন : ২ : যেসব খৃষ্টান এক আল্লাহ ও ইসা আ. এর ওপর বিশ্বাস রাখেন, তাদের কী হবে?

উত্তর : রাসূল স. এর আগমনের পর তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনই একমাত্র দীন। কাজেই তাঁর প্রতি বিশ্বাস না থাকায় তাদের অবস্থাও প্রথম উত্তরে উল্লিখিত মানুষের অবস্থার অনুরূপ হবে।

প্রশ্ন : ৩ : যেসব এলাকায় ইসলামের বাণী পৌঁছে নি, তাদের কী বিধান।

উত্তর : যারা ইসলাম গ্রহণ করেন নি, তাদের মধ্যে দু’ধরনের লোক রয়েছে।

এক : যারা মুসলিমদের মাঝে ছিলেন, ইসলামের কথা শুনেছেন, ইসলাম সম্পর্কে জানা তাদের জন্য সহজ ছিল, এরপরও তারা ইসলাম সম্পর্কে অনুসন্ধান করেননি। তাদের অবস্থা প্রথম প্রশ্নের উত্তরে প্রদত্ত লোকদের অবস্থার অনুরূপ হবে। অর্থাৎ, তাদের জন্য জাহান্নামই নির্ধারিত থাকবে।

দুই : যারা অমুসলিমদের মাঝে ছিলেন, ইসলাম সম্পর্কে জানার কোনো উপায় ছিল না। ইসলামের কথা কখনো শুনেনও নি। তাদের অবস্থা আহলুল ফাতরাত এর মতো হবে। অর্থাৎ, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের পরীক্ষা করবেন। যেমন বলবেন, আগুনে ঝাপ দাও। যারা তাঁর অনুসরণ করবে, তারা আগুনে ঝাপ দিয়ে দেখবে সেটা শীতল বেহেশত। যারা অমান্য করবে, তারা সত্যিই জাহান্নামে যাবে।

এভাবে আল্লাহ তাদের কাছ থেকে আনুগত্যের পরীক্ষা নিবেন। তিনি বলেন,

وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولاً

রাসূল না পাঠিয়ে আমি কাউকে শাস্তি দেই না। (ইসরা : ১৫)

ইবনে কাসীর রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এটা আল্লাহর ইনসাফের প্রকাশ। আল্লাহ কাউকে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ ছাড়া শাস্তি দিবেন না। হয়ত রাসূল প্রেরণের মাধ্যমে বা অন্য কোনো ভাবে দাওয়াত পৌঁছানোর মাধ্যমে।

কাজেই তাদের পরিণাম কী হবে তা ক্বিয়ামতের দিনই নির্ধারিত হবে।

আল্লাহ আমাদের হিদায়াতের পথে চলার তাওফীক দিন। আমীন।