প্রসঙ্গ আল্লামা আহমদ শফী হাফিজাহুল্লাহর বক্তব্য ও আমাদের অতি-প্রতিক্রিয়া:

– হযরত আমাদের দাদা উস্তায। আমাদের অনেকের উস্তাযের উস্তায তিনি। তাঁর বয়স প্রায় শতাধিক। আমাদের বর্তমান প্রজন্মের সাথে তাঁর সময়ের পার্থক্য প্রায় দুই-তিন প্রজন্ম। তাঁর যে কোনো কথা বর্তমান প্রজন্মের বুঝতে হলে প্রজন্মের অনুবাদযন্ত্রে অনুবাদ করে নিতে হবে। আমাদের আশির দশকে বা আরো আগে যাদের জন্ম, তারা জানেন তাদের দাদা-দাদীর কথার ধরণ। সব কথাকে লিটারাল বা আক্ষরিক অর্থে নিলে সমস্যা হবে। এমনকি খোদ আমাদের সাথেই পরের দশকের প্রজন্মের বুঝে বিরাট পার্থক্য ধরা পড়ে।

– হযরত নারীদের সুনির্দিষ্ট ক্লাসের পর স্কুল-কলেজে না পড়ানোর ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন। আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষিতকে সামনে রেখে প্রত্যেক কন্যা সন্তানের অভিভাবকই চিন্তিত। আমি নিজেই আলহামদুলিল্লাহ কন্যা সন্তানের বাবা। আমার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজন অনেকেও কন্যা সন্তানের বাবা। একেকটি ধর্ষণের খবর আমাদের প্রত্যেক অভিভাবককে কীভাবে দুমড়ে মুচড়ে দেয়, তা বলার প্রয়োজন বোধ করছি না। স্কুল কলেজে পাঠিয়ে এর প্রাঙ্গণে মায়েরা অপেক্ষা করেন, কোথাও গিয়ে ফিরতে দেরি হলে শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যায়। নারীর নিরাপত্তার কথা ভাবলে আমাদের দেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র মনে হয়। কয়েক মাসের শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধা নারী কেউই নিরাপদ নয় এখানে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কোচিং সেন্টার, বাস বা কোনো যানবাহন, পথ-ঘাট, নিজ বা আত্মীয়ের বাসা, পরিবারের লোকজন, বন্ধু, শিক্ষক – কোথাও কারো কাছে নিরাপদ নন নারীরা। বিশ্বাস না হলে আপনার আশ-পাশের যে কোনো কন্যা সন্তানের অভিভাবককে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। রাষ্ট্র যখন অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে, অপরাধ রোধ করতে, এবং অপরাধের বিভিন্ন কারণ (মাদক, পর্নোগ্রাফি) বন্ধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেক্ষেত্রে একজন সচেতন দাদা উস্তায তার ছাত্রদেরকে এমন পরামর্শ দেয়াটা কি গুরুতর অপরাধ?

– মনে রাখতে হবে, এটা কোনো ফাতওয়া নয়। এটা হযরতের তাঁর ছাত্রদের প্রতি পরামর্শ বৈ কিছু নয়। এটা সর্বসাধারণের উদ্দেশে তাঁর পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতিও নয়।

– ইসলামে পোপ টাইপের সংস্কৃতি নেই। পোপ কিছু বললেই যেমন তা অনেকটা ধর্ম হয়ে যায়, ইসলামে তেমন নয়। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে একজন স্কলার মত ব্যক্ত করতে পারেন বা ফাতওয়া দিতে পারেন, তবে তা সমসাময়িক অন্য স্কলারবৃন্দ যাচাই করে থাকেন। একাডেমিক উপায়ে তার সমালোচনা করে থাকেন, স্বাভাবিক আদব (শিষ্টাচার) বজায় রেখে। কাজেই এটাকে পোপীয় বানীর মতো ধরে নিয়ে ‘ইসলাম গেল ইসলাম গেল’ মনে করার যথার্থতা প্রশ্নবিদ্ধ।

– অনেকে হযরতের পদত্যাগ দাবী করছেন। ব্যাপারটা প্রথমত তাঁর ঐচ্ছিক বিষয়। দ্বিতীয়ত, সালাফের মধ্যে আমৃত্যু ইলমের খিদমতে লেগে থাকার নজীর অনেক। হয়ত শেষ বয়সে দৃষ্টিশক্তি লোপ পেয়েছে, বা স্মরণশক্তি লোপ পেয়েছে, কিন্তু ওনার ক্লাস চলেছে আমৃত্যু। পরবর্তীকালে জীবনী গ্রন্থকাররা এগুলো যত্ন সহকারে উল্লেখও করেছেনে, এবং তাঁদের শেষ বয়সের হাদীস গ্রহণে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের জীবদ্দশায় পদত্যাগের দাবী উঠেছে তেমনটা জানা যায় না। বরং, বয়স্ক মুরুব্বি উস্তাযের সামনে হাদীস পড়ে উচ্চতর সনদ (রাসূল স. পর্যন্ত হাদীসের চেইন) নেয়ার নজীর অনেক।

– শেষ করছি আদবের গুরুত্ব নিয়ে। সালাফ রাহিমাহুল্লাহ ইলমের আগে আদব শেখাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আব্দুল্লাহ বিন মুবারক রহ. বলেন, “আমি ত্রিশ বছর আদব শিখেছি, এবং বিশ বছর ইলম শিখেছি, সালাফ ইলম অর্জনের পূর্বে আদব শিখতেন।”

قال الإمام عبدالله بن المبارك رحمه الله : ( طلبت الأدب ثلاثين سنة , وطلبت العلم عشرين سنة , وكانوا يطلبون الأدب قبل العلم ).غاية النهاية في طبقات القراء 1/ 198.

আল্লাহ আমাদেরকে যথাযথ আদবের সাথে ভিন্নমত প্রকাশের তাওফীক দিন। আমীন।