সম্প্রতি একটি জমিজমা সংক্রান্ত ব্যাপার মোটামুটি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে যা আবিষ্কার করলাম:

– গত চার প্রজন্ম ধরে জমি বণ্টন করা হয় নি
– পাঁচ প্রজন্ম আগে মেয়ে জমি পেলেও চার প্রজন্ম আগে বোনের ভাগ দেয়া হয় নি
– গত চার-পাঁচ প্রজন্ম ধরে মৌখিক ভাবে জমি অদল-বদল করা হয়েছে, ফলে এ ব্যাপারে কোনো লিখিত সমাধানে পৌঁছা যথেষ্ট দু:সাধ্য
– গত দুই প্রজন্ম এলোমেলোভাবে ভোগ করে আসছে একে অন্যের অংশ

আমরা দেখলাম, এতে যে শুধুই একে অন্যের সম্পদ ভোগ হয়েছে তা নয়, বরং, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সংঘাত তৈরি হয়েছে। যেহেতু লিখিত কিছু হয় নি, ওয়ারিশদের প্রত্যেকেই একে অপরের কাছে প্রতিষ্ঠিত হক্বের চেয়ে প্রত্যাশা বেশি করেছে, বাস্তবে পেয়েছে কম, যা অসন্তোষ তৈরি করেছে।

আরো দেখেছি, বাবা কোনো এক সন্তানের অর্থায়নে অনেক জমি কিনেছেন, কিন্তু নিজের নামে। বণ্টনের সময় সবার মাঝে হক অনুযায়ী বন্টিত হয়েছে। আবারো প্রত্যাশা-প্রাপ্তির সংঘাত, ফলাফল = অসন্তোষ।

ভদ্র পরিবারে এই অসন্তোষ মিইয়ে থাকলেও প্রায় পরিবারেই তা দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে রূপ নেয়।

ইসলামী অর্থনীতির মূল কথা দুটো:

১. রিবা বা আর্থিক লেনদেনে সবরকম জুলুম পরিহার করা
২. গারার বা সবরকম অনিশ্চয়তা/গোঁজামিল পরিহার করা

প্রতিটি লেনদেন বা চুক্তি হবে সুস্পষ্ট, সকল পক্ষের জন্য ইনসাফপূর্ণ।

আরবীতে একটি প্রবাদ আছে,

تعاملوا كالأجانب و تعاشروا كالأقارب
‘লেনদেন করো অপরিচিতের ন্যায়, আর ব্যবহার করো আত্মীয়ের ন্যায়।’

মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে তার সম্পদের মালিকানা ওয়ারিশদের নিকট আল্লাহর আইন অনুসারে চলে যায়, তা বাস্তবে বণ্টন করা হোক বা না হোক। মৃত ব্যক্তির কোনো মালিকানা থাকে না, আর মালিকানা ছাড়া কোনো সম্পদ হতে পারে না।

বণ্টনের আগে সবার হক মিশ্রিত থাকে, এককভাবে কেউ ভোগ করলে তা সবার অনুমতি সাপেক্ষে করা উচিৎ, নতুবা অন্য পক্ষ তার জুলুমের স্বীকার হন। অন্যরা অনুমতি দিলে এটা তাদের ইহসান, না দিলে এটা তার হক্ব, নিন্দনীয় নয়।

ঠিক তেমনি, বণ্টনের সময় প্রত্যেককে তার প্রাপ্য ইনসাফপূর্ণ উপায়ে বুঝিয়ে দেয়া সকলের কর্তব্য। প্রতিটা সম্পদ এমনভাবে বণ্টন করা উচিৎ যেন সবাই যথাসম্ভব সমান পান। এরপর উনিশ-বিশ হলে তা অর্থ দিয়ে বা অন্য উপায়ে সমাধান করা যেতে পারে।

বোন/ মেয়ের হক ব্যক্তির মৃত্যুর সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তাকে তা বুঝিয়ে দেয়া না হলে তা সুস্পষ্টভাবে জুলুম এবং অন্যের সম্পদ ভোগ বলে গণ্য হবে, যার জন্য কিয়ামতের দিন জবাব দিতে হবে।

আমরা লক্ষ্য করেছি, আমাদের সমাজে নামায-রোযাসহ অন্যান্য ইবাদতের ব্যাপারে আমরা যতটুকু দায়িত্বশীল, আর্থিক ব্যাপারগুলোতে শরীয়াহ পরিপালন আমাদের কাছে সে তুলনায় গুরুত্বহীন। অথচ পরের ব্যাপারটাতে আল্লাহর হকের পাশাপাশি বান্দার হকও জড়িত, যার ক্ষমা পাওয়ার প্রসেসটা যথেষ্ট জটিল।

আমাদের সম্মিলিতভাবে এসব ব্যাপারে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। রিবামুক্ত ইনসাফপূর্ণ অর্থনীতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে হবে সবার।

আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।